লুজ ক্যারেকটার বনাম ‘চরিত্র’: সূক্ষ্ম পার্থক্যের গোলকধাঁধা
তপন সিংহ পরিচালিত পুরনো দিনের মুভি ‘বাঞ্ছারামের বাগান’। সেই চলচ্চিত্রের সেই বিখ্যাত সংলাপ আওরাতেন অভিনেতা দীপঙ্কর দে। তিন যখন অনবদ্য ভঙ্গিতে কাউকে ‘লূ-উ-উ-ছ ক্যারেকটার’ বলে গাল দিতেন, তখন তা হাসির উদ্রেক করলেও আসলে তা ছিল এক চরম সামাজিক সত্যের রম্য রূপ।
কিন্তু এই ‘লুজ ক্যারেকটার’ বা চরিত্রদোষ বিষয়টিকে যদি কিংবদন্তি সাহিত্যিক তারাপদ রায়ের চশমা দিয়ে দেখা যায়, তবে তা কেবল গালিতে আটকে থাকে না। নিখাদ বিনোদন আর সূক্ষ্ম ব্যঙ্গের এক দারুণ কোলাজ হয়ে ওঠে।
রাজশেখর বসুর ‘চলন্তিকা’ অভিধান মতে চরিত্রদোষের অর্থ— ‘লাম্পট্য ও সুরাসক্তি’। তবে আমাদের সমাজ এই গূঢ় বিষয়গুলো নিয়ে একটু বেশিই রক্ষণশীল। এই যেমন ধরুন, কোনো পুরুষ যদি তাঁর নিজের বিবাহিত স্ত্রীকে বাঁকা চোখে তাকিয়ে বলেন, “মাইরি বলছি, তোমাকে আজ যা দেখাচ্ছে না। একেবারে পরস্ত্রীর মতো!” তবে তাকে আপনি কী বলবেন? শাস্ত্র বলে ‘পরস্ত্রীকে মাতৃবৎ দেখবে’, কিন্তু রসিক পুরুষদের মনের অন্দরে পরস্ত্রীর রূপ যেন একটু বেশিই মোহময়ী!
বউকে গল্প বলতে গিয়ে একি বিপদ অমিতের

কোটের ওপর প্রেমিকার চুল: স্ত্রীর কাছে রামধরা
তবে পুরুষেরা বিভিন্ন কায়দা-কানুন করেন। বুদ্ধি খাঁটিয়ে নিজেদের এই ‘লুজ ক্যারেকটার’ লুকিয়ে রাখার চেষ্টা করেন। কিন্ত দিনশেষে ঠিকই বউয়ের কাছে ধরা পরেন। মিস্টার চৌধুরীর গল্পটাই ধরা যাক। অত্যন্ত সংগোপনে অফিসের সহকর্মীর সঙ্গে জমিয়ে প্রেম করছিলেন।
সুবোধ বালকের মতো রোজ ঠিক সময়ে বাড়িও ফিরতেন। কিন্তু বিপত্তি ঘটল জন্মদিনে! স্ত্রী উপহার দিলেন চুল পড়ে যাওয়ার ওষুধ। মিস্টার চৌধুরীর মাথায় তো ঘন চুল, তিনি অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করতেই স্ত্রী গম্ভীরভাবে বললেন, “তোমার উঠছে না গো, তোমার প্রেমিকার খুব চুল উঠছে। রোজই তোমার কোটে লেগে থাকে। আমাকে বুরুশ করে পরিষ্কার করতে হয়!” ভাবুন একবার, চোরের দশ দিন তো সাধুর একদিন!

ও তো দুপুরেই ফিরে এল! অপরাধবোধের এক অদ্ভুত উল্টো যুক্তি
আবার এই চরিত্রদোষের খেলা কিন্তু কেবল পুরুষালি ব্যাপার নয়। ‘এক হাতে তালি বাজে না’— মহিলারাও মাঝে মাঝে এই খেলায় মেতে ওঠেন। এক ভদ্রমহিলাকে তাঁর স্বামী দিনদুপুরে অন্য এক পুরুষের সাথে আপত্তিকর অবস্থায় ধরে ফেললেন। মামলা গড়াল থানা পর্যন্ত। বিচক্ষণ দারোগাবাবু যখন জিজ্ঞেস করলেন, “আপনি তাহলে আপনার স্বামীকে ঠকাচ্ছিলেন?”
ভদ্রমহিলা উল্টো ফোঁস করে উঠে বললেন, “আমি ঠকাচ্ছিলাম? আমার বরই আমাকে ঠকিয়েছে! ও বলেছিল ফিরতে রাত হবে, অথচ দুপুরে ফিরেই আমাকে জব্দ করল। ওই তো ঠকাল, আমি আর কী ঠকালাম!” অপরাধবোধের এমন উল্টো যুক্তি কেবল রম্য গল্পেই সম্ভব!
চার্লস ডিকেন্সের বিশ্ব সেরা গল্প শুনুন

রিভলভারের গুলি এবং সুরমার ভাগ্য
সবচেয়ে মোক্ষম গল্পটি অবশ্য দুই রুমমেট বিনতা ও সুরমার। খবরের কাগজে এসেছে, এক নামী ফিল্মস্টার। এক সঙ্গিনী নিয়ে মজা করছিলেন। টের পেয়ে ফ্লিমস্টারের স্ত্রী রিভলবার নিয়ে ঘরে ঢুকেন। স্বামীর সঙ্গিনীকে ছয়টি গুলি করে ঝাঁঝরা করে দিয়েছেন।
বিনতা শিউরে উঠে বলল, “কী সাংঘাতিক ব্যাপার!” কিন্তু সুরমা চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে বলল, “ব্যাপারটা আরও সাংঘাতিক হতে পারত। কারণ গতকাল ওই ফিল্মস্টারের সাথে আমার অ্যাপয়েন্টমেন্ট ছিল। মাথা ধরেছিল বলে যাইনি। গেলে ওই রিভলভারের গুলিতে আমিই ঝাঁঝরা হতাম!”
আসলে ‘লুজ ক্যারেকটার’ বা চরিত্রদোষ নিয়ে সমাজে যতই ঢাক-ঢাক গুড়-গুড় থাকুক না কেন, মানুষের জীবনের এই স্খলন আর গোপন কীর্তিগুলো যখন সাহিত্যের পাতায় উঠে আসে, তখন তা আমাদের যেমন হাসায়, তেমনই এক অদ্ভুত বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেয়।
আপনার চারপাশেও কি এমন কোনো ‘লুজ ক্যারেকটার’ বা মজার ঘটনা আছে? কমেন্ট বক্সে আমাদের জানাতে ভুলবেন না!
লেখক – সেলিম হোসেন – তাং – ১৯/০৬/২০২৬ ইং – প্রতীকী ছবি গুলো এআই জেনারেটেড।

