পতিতালয়ের দারোয়ান — জীবন বদলে যাওয়ার গল্প
ঢাকার পুরান অংশ, ইংলিশ রোড। এখানে একটি পতিতালয় ছিল। চারপাশের মানুষ জায়গাটিকে ভালো চোখে দেখত না। দিনের বেলায় ভিড় কম থাকত। রাত নামতেই ভিড় বাড়ত। পতিতালয়ের মূল ফটকে বসে থাকত করিম মিয়া নামের এক দারোয়ান। বয়স পঞ্চাশ ছুঁইছুঁই। মুখভর্তি সাদাকালো দাড়ি, হাতে সবসময় একটি পুরোনো লাঠি।
করিম মিয়ার বাবা আর দাদাও এই একই জায়গায় দারোয়ানের কাজ করতেন। যেন পেশাটা তাদের বংশগত হয়ে গিয়েছিল। বেতন খুবই কম, কিন্তু করিম মিয়ার আর কোনো উপায়ও ছিল না। কারণ ছোটবেলায় অভাবের কারণে তার স্কুলে যাওয়া হয়নি। লিখতে-পড়তে না জানায় অন্য কোথাও চাকরি পাওয়ারও সুযোগ ছিল না।
বছরের পর বছর সে চুপচাপ নিজের কাজ করে গেছে। কে আসছে, কে যাচ্ছে—সব নজরে রাখত। এলাকার সবাই তাকে চিনত একজন সৎ ও নিরীহ মানুষ হিসেবে।
জীবনের হাহুতাশ দূর করতে যা করবেন

ইংলিশ রোডের পতিতালয় – জীবন বদলে যাওয়ার গল্প
একদিন পতিতালয়টি উচ্ছেদ হল। ত্রিশ বছরের চাকরি এক মুহূর্তেই শেষ হয়ে গেল। অল্প কিছু টাকা জমিয়েছিল করিম মিয়া। মন খারাপ করে বাসায় ফিরল। স্ত্রীও কয়েক বছর আগে মারা গেছেন। ছোট্ট ভাঙা ঘরে বসে সে ভাবতে লাগল—এখন কী করবে?
হঠাৎ তার মাথায় একটা চিন্তা এল।
পতিতালয়ে কাজ করার সময় ছোটখাটো দরজার কবজা লাগানো, তালা মেরামত, পাইপ ঠিক করা—এসব কাজ সে প্রায়ই করত। হাতের কাজে সে বেশ দক্ষ ছিল। তাই সিদ্ধান্ত নিল, কিছু যন্ত্রপাতি কিনবে। গ্রামে ফিরে যাবে।
নারায়ণগঞ্জ থেকে একটা টুলবক্স কিনে আনল। তার কয়েক গ্রামের আশপাশে কোন তখন হার্ডওয়্যারের ভালো দোকান ছিল না। মানুষকে প্রয়োজনীয় জিনিস কিনতে দূরের শহরে যেতে হতো।
কয়েকদিন পর পাশের বাড়ির এক লোক এসে বলল,
— “করিম ভাই, একটা রেঞ্চ হবে? দরজার নাট খুলতে হবে।”
করিম মিয়া তাকে সাহায্য করল।
তারপর আরেকজন এল হাতুড়ি নিতে। কেউ স্ক্রু-ড্রাইভার চাইল, কেউ তালা।
তখন করিম মিয়ার মাথায় নতুন বুদ্ধি এল।
সে মানুষদের বলল,
— “আপনারা চাইলে আমি শহর থেকে প্রয়োজনীয় জিনিস এনে দিতে পারি।”
এলাকার মানুষ খুশি হয়ে গেল। কারণ তাদের আর দূরে যেতে হচ্ছিল না।
ধীরে ধীরে করিম মিয়া ছোট একটা হার্ডওয়্যারের দোকান খুলল। দোকানের নাম দিল — “বিশ্বাস হার্ডওয়্যার”।
তার সততা আর পরিশ্রমের কারণে ব্যবসা দ্রুত বড় হতে লাগল। কয়েক বছরের মধ্যে ছোট দোকান বড় শোরুমে পরিণত হলো। আশেপাশের কয়েকটি জেলাতেও তার ব্যবসা ছড়িয়ে পড়ল।
একসময় সেই করিম মিয়াই এলাকার সবচেয়ে সম্মানিত ব্যবসায়ীদের একজন হয়ে উঠলেন। একদিন উপজেলা চেয়ারম্যান তাকে স্থানীয় উন্নয়নে অবদানের জন্য সংবর্ধনা দিলেন। অনুষ্ঠানে তাকে সম্মানসূচক খাতায় স্বাক্ষর করতে বলা হলো।
ইংলিশ রোডের উপর নির্মিত ভিডিও টি দেখতে পারেন

করিম মিয়া মৃদু হেসে বললেন, “স্যার, আমি আসলে লিখতে-পড়তে জানি না।”
সবাই অবাক হয়ে গেল।
চেয়ারম্যান বিস্মিত হয়ে বললেন, “আপনি লেখাপড়া জানেন না, তবুও এত বড় ব্যবসা দাঁড় করিয়েছেন! যদি পড়াশোনা জানতেন, তাহলে তো আরও বড় কিছু হতে পারতেন!”
করিম মিয়া একটু হেসে শান্ত গলায় উত্তর দিলেন, “না স্যার… বিষয়টা লেখাপড়ার না। জনতা যদি পতিতালয় উচ্ছেদ না করত, তাহলে সেই পতিতালয়ের ফটকে দারোয়ান হিসেবেই বসে থাকতাম।”
পুরান ঢাকার তাঁতিবাজার মোড় থেকে নবাবপুর রোড ও জনসন রোডের সংযোগ রাস্তাটি ইংলিশ রোড নামে পরিচিত। পতিতালয়ের সেই পুরাতন বিল্ডিং টা এখনো আছে।
লেখক – সেলিম হোসেন – তাং – ০৯/০৬/২০২৬ ইং – প্রতীকী ছবি গুলো এআই জেনারেটেড।

