লাল আটা নাকি সাদা আটা: সুস্থ থাকতে কোনটি সেরা। জেনে নিন অজানা তথ্য

কোন আটা ভালো

লাল আটা নাকি সাদা আটা—সুস্থ থাকতে আমাদের কী জানা জরুরি?

মাছে-ভাতে বাঙালির খাদ্যতালিকায় এখন রুটি বা আটার তৈরি খাবারের জয়জয়কার। সকালের নাস্তায় গরম রুটি-পরোটা কিংবা বিকালের নাস্তায় বিস্কুট, সিঙ্গারা বা স্যান্ডউইচ—আমাদের প্রতিদিনের ৮০ শতাংশ খাবারই আসে গম থেকে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, আমরা যা খাচ্ছি তা কি আদৌ স্বাস্থ্যকর?

আটা ও ময়দার পার্থক্য কী?

আটা এবং ময়দা—দুটোই গম থেকে তৈরি হলেও এদের উৎপাদন প্রক্রিয়া ভিন্ন:

  • আটা: গম পিষে আটা তৈরি করা হয়। এতে গমের বীজের সঙ্গে তার খোসাও থাকে, তাই এর রঙ কিছুটা বাদামী বা লালচে হয়।

  • ময়দা: আটাকে বারবার পরিশোধিত করে এবং খোসা আলাদা করে সাদা ধবধবে ময়দা তৈরি করা হয়। এটি অধিক রিফাইন করা হয় বলে এর পুষ্টিগুণ আটার চেয়েও কম।

একটি ছোট হাসির গল্প: রুটি খাওয়ার নিয়ম

এক ভদ্রলোকের ওজন বেড়ে যাওয়ায় তিনি ডাক্তারের কাছে গেলেন। ডাক্তার সব পরীক্ষা শেষে বললেন, “এখন থেকে ওজন কমাতে তিনবেলা রুটি খাবেন।” ভদ্রলোক খুব বিনয়ের সাথে জিজ্ঞেস করলেন, “স্যার, রুটি কি ভাত খাওয়ার আগে খাব নাকি পরে?”

শিক্ষা: ওজন কমাতে হলে খাবারের সঠিক নিয়ম এবং গুণগত মান জানা প্রয়োজন।

আটা

কেন লাল বা সাদা কোনো আটাই পুরোপুরি নিরাপদ নয়?

অনেকেই মনে করেন লাল আটা স্বাস্থ্যের জন্য খুব ভালো। কিন্তু বর্তমান সময়ের গবেষণায় ভিন্ন কিছু উঠে আসছে। এর প্রধান কারণ হলো জেনেটিক্যালি মডিফাইড অর্গানিজম (GMO)

১. ড. নরম্যান বোরল্যাগ ও আধুনিক গম: ১৯৭০ সালের দিকে আমেরিকান বিজ্ঞানী ড. নরম্যান বোরল্যাগ গমের জিন পরিবর্তন করে এর ফলন এবং স্বাদ বহুগুণ বাড়িয়ে দেন। এর জন্য তিনি নোবেল শান্তি পুরস্কারও পান। কিন্তু এই ‘ম্যাজিক’ গমই আজ মানবদেহের জন্য কাল হয়ে দাঁড়িয়েছে।

২. প্রদাহ এবং রোগব্যাধি: জেনেটিক্যালি মডিফাইড এই আটা বা ময়দা মানবদেহে প্রদাহ (Inflammation) তৈরি করে। এর ফলে উচ্চ রক্তচাপ, স্ট্রোক, ক্যান্সার এবং হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়ছে। আজকের দিনের তরুণদের মাঝেও যে হার্ট অ্যাটাকের হার বেড়েছে, তার পেছনে এই অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস অনেকটা দায়ী।

৩. ক্ষতিকর গ্লুটেন (Gluten): আধুনিক গমে থাকা অতিরিক্ত গ্লুটেন আমাদের হজম প্রক্রিয়ায় সমস্যা সৃষ্টি করে এবং শরীরের দীর্ঘমেয়াদী ক্ষতি করে।

আটা কি ওজন কমায়?

এটি একটি ভুল ধারণা। গবেষণায় দেখা গেছে, সাদা চালের ভাতের চেয়েও আটা বা ময়দার গ্লাইসেমিক ইনডেক্স (GI) অনেক সময় বেশি থাকে। ফলে এটি রক্তে শর্করার মাত্রা দ্রুত বাড়ায় এবং চর্বি জমাতে সাহায্য করে। তাই ওজন কমাতে আটার ওপর নির্ভর করা সবসময় বুদ্ধিমানের কাজ নয়।

ইতিহাসের পাতায় রুটি

যীশু খ্রিস্টের সময়েও রুটি ছিল অত্যন্ত পবিত্র একটি খাবার। তিনি রুটিকেই শ্রম ও আধ্যাত্মিকতার প্রতীক হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন। কিন্তু মনে রাখতে হবে, যীশুর সময়কার সেই আদি গম এবং আজকের জিন-পরিবর্তিত গম এক নয়। আদি গমের পুষ্টিগুণ বর্তমানের বাণিজ্যিক গমের চেয়ে অনেক উন্নত ছিল।

আটা

সুস্থ থাকার উপায় কী?

  • নন-জিএমও (Non-GMO): চেষ্টা করুন প্রাকৃতিক বা আদি জাতের শস্য খেতে।

  • খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তন: আটার ওপর নির্ভরতা কমিয়ে প্রচুর শাকসবজি, ফলমূল এবং প্রোটিন সমৃদ্ধ খাবার গ্রহণ করুন।

  • সচেতনতা: হোটেলের ডুবো তেলে ভাজা ময়দার খাবার পরিহার করুন।

আটা

উপসংহার: সুস্থ থাকতে হলে আমাদের জানতে হবে আমরা কী খাচ্ছি। অতিরিক্ত প্রক্রিয়াজাত খাবার বর্জন করে একটি ‘হেলদি লাইফস্টাইল’ গড়ে তোলাই হোক আমাদের লক্ষ্য।

লেখক: সেলিম হোসেন

তারিখ: ২৬/০১/২০২৪ ইং

তথ্যসূত্র: ড. এরিক বার্গ, ড. জাহাঙ্গীর কবির, ড. মজিবুল হক এবং ড. স্টেন একবার্গ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *