ঢাকা শহরের যানজট ও ঢাকাইয়া রসিকতা: মুড়ির টিন থেকে ঘোড়ার গাড়ি।

ঢাকা শহরের যানজট

ঢাকা শহরের যানজট: ধীরগতির শহর ও ঢাকাইয়াদের চিরায়ত রঙ্গ

বর্তমানে ঢাকা মানেই যেন যানজটের শহর। সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ব্যুরো অফ ইকোনমিক রিসার্চের এক গবেষণায় ঢাকা বিশ্বের সবচেয়ে ধীরগতির শহরের তালিকায় প্রথম হয়েছে। শুধু ঢাকা নয়, আমাদের ময়মনসিংহ (৯ম) এবং চট্টগ্রাম (১২তম) শহরও এই তালিকায় জায়গা করে নিয়েছে। ফ্লাইওভার, মেট্রোরেল কিংবা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে—এত উন্নয়নের পরেও ঢাকার রাস্তায় চলাচলের গতি বাড়েনি, যা আমাদের অর্থনীতি ও মানসিক স্বাস্থ্যে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।

রিক্সা এবং হেলদি লাইফ স্টাইলের গল্প। 

ঢাকা শহরের যানজট
এই জ্যাম কবে ছাড়বে !

১.মুড়ির টিন ও ‘লাশ’ রহস্য

৫০ বা ৬০-এর দশকে ঢাকা ছিল বেশ নিরিবিলি। তখন রাস্তায় আজকের মতো এত জ্যাম ছিল না, তবে ছিল লক্কড়-ঝক্কড় মার্কা বাস, যেগুলোকে মানুষ ভালোবেসে ডাকত ‘মুড়ির টিন’। একবার এক ঢাকাইয়া সেই বাসে করে গুলিস্তান যাচ্ছিলেন। বাসে প্রচণ্ড ভিড়। এক নাদুস-নুদুস লোক ভিড়ের চাপে ক্লান্ত হয়ে সেই ঢাকাইয়ার কাঁধে মাথা রেখেই ঘুমিয়ে পড়লেন।

বাস গুলিস্তান পৌঁছালে ঢাকাইয়া লোকটি নামার চেষ্টা করলেন, কিন্তু সেই ঘুমন্ত লোক আর নড়ে না। অনেক ডাকাডাকির পর তিনি লোকটির কানের কাছে মুখ নিয়ে বললেন:

“এই যে ভাইজান, আছেন না গেছেন গা হেই পারে? লাশটা অহন ছরান আমার ওপর থেইকা। আমি হালায় নামুম, বাড়ির কাছে আইছা গেছিগা!”

‘লাশ’ শব্দ শুনেই লোকটির কাঁচা ঘুম ভেঙে চুরমার! তিনি ভয়ার্ত চোখে তাকাতেই ঢাকাইয়া লোকটি মুচকি হেসে বাস থেকে নেমে গেলেন।

দুষিত শহরের তালিকায় ঢাকা শহর। 

ঢাকা শহরের যানজট 

২. মাছের বাজার না কি মৌচাক?

এখন ইলিশ মাছ মানেই রাজকীয় ব্যাপার। কিন্তু কয়েক যুগ আগে দৃশ্যটা ছিল ভিন্ন। তখন বাজারে মাছ ছিল বেশি, ক্রেতা ছিল কম।

এক দুপুরের ঘটনা। বাজারে প্রচুর ইলিশ উঠেছে কিন্তু ক্রেতা নেই। রুপালি ইলিশের ওপর ঝাঁকে ঝাঁকে মাছি ভনভন করছে। এক রসিক ক্রেতা এক দোকানদারকে মশকরা করে বললেন:

“আগে তো জানতাম এইডা মাছের বাজার। মাউছারা বেচে, খইদ্দাররা কিনে। আপনে ভাই মাছ বাজারে ‘মৌচাক’ লইয়া বইছেন ক্যা?”

মাছের ব্যাপারীও কম যান না। বিরক্ত হয়ে উত্তর দিলেন:

“আপনে হালায় বুঝবার পারেন নাই ক্যা? বাটপার আর ঠগবাজে বাজার ভইরা গেছে, তাই মাছ বেচা ছাইড়া দিছি। অহন ‘মধুর চাক’ বেচি। খাঁটি মানুষ অইলে ভিতরে মধু পাইব, নইলে হালায় পুঙ্গার মধ্যে কামড় খাইব!”

ক্রেতার উপর ঢাকাইয়া দোকানদার যখন ত্যাক্ত বিরক্ত। 

ঢাকা শহরের যানজট

৩. নবাবজাদার ঘোড়ার গাড়ি চড়া 

তখনও ঢাকা শহরে যানজট ছিল না; চলাচলের প্রধান বাহন ছিল ঘোড়ার গাড়ি। একদিন এক গাড়োয়ান ফাঁকা রাস্তায় বেশ জোরে গাড়ি চালাচ্ছিলেন। হঠাৎ দেখলেন এক লোক রাস্তার মাঝখান দিয়ে হেলেদুলে হেঁটে যাচ্ছেন, সরার কোনো নামগন্ধ নেই।

গাড়োয়ান বিরক্ত হয়ে গাড়ি থামিয়ে লোকটির কাছে গিয়ে সালাম দিলেন।

গাড়োয়ান: “আসসালামু আলাইকুম, আপনের আব্বাজানে কিমুন আছে?”

পথচারী (অবাক হয়ে): “আমার আব্বারে আপনি চিনেন? কিন্তু আমিতো আপনারে চিনবার পারলাম না!”

গাড়োয়ান: “চিনবেন কেমতে? আমি হইলাম সামান্য গাড়োয়ান। আর আপনের বাপ তো ঢাকার নবাব সাব! হেই তো এই রাস্তাডা বানাইছে। আপনে নবাব সাহেবের পোলা না অইলে কি আর রাস্তার মাঝখান দিয়া এমনে হাঁটেন?”

লোকটির মুখ মুহূর্তেই কালো হয়ে গেল। কোনো কথা না বলে সুড়সুড় করে রাস্তার একপাশ দিয়ে হাঁটতে শুরু করলেন।

ছাগল যখন ক্রেতাকে ছাগল বানিয়ে দেয়। 

ঢাকা শহরের যানজট

উপসংহার

ঢাকা শহরের এই যানজট আর কোলাহল আমাদের জীবনের অংশ হয়ে গেছে। তবে শত প্রতিকূলতার মাঝেও ঢাকাইয়াদের এই রসবোধ আমাদের ক্লান্তি কিছুটা হলেও দূর করে। উন্নয়ন হোক, গতি বাড়ুক—কিন্তু আমাদের এই ঐতিহ্যবাহী রঙ্গ রসিকতা যেন হারিয়ে না যায়।

লেখক: সেলিম হোসেন

তারিখ: ০৪/১১/২০২৩

(ছবিগুলো প্রতীকী)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *