ভাস্কো-দ্য-গামা – ভারতবর্ষের সমুদ্র পথ আবিষ্কারের পরিকল্পনা
আজকের দিনে যাতায়াত কত সহজ। কিন্ত সেই ১৪০০ সালের দিকে এমন টা ছিল না। স্থলপথে যাতায়াত ছিল কঠিন। সমুদ্র পথে সে তুলনায় অনেক টা সহজ। কিন্ত মৃত্যুভয় সবসময় তাড়া করত সমুদ্র যাত্রায়। দুঃসাহসিক নাবিক ভাস্কো-দ্য-গামা বেরিয়ে পরেন ভয় কে জয়কে করতে। সেই রোমাঞ্চকর কাহিনী জানাব আজ।
উত্তমাশা অন্তরীপ হতে রাজার পাঠানো পর্তুগীজ জাহাজ পর্তুগালে ফিরল। এর অল্প দিনের মধ্যে পর্তুগালের রাজা দ্বিতীয় জনের মৃত্যু হয়। প্রথম ম্যানুয়েল পরবর্তী রাজা হন। তিনি জানতে পারেন যে, ক্রিস্টোফার কলম্বাস পশ্চিম দিকে যাত্রা করে বাহামা নামক কিছু জায়গা আবিষ্কার করেছেন। সেটিকে স্পেনের একীভূত বলে ঘোষণা করা হয়েছে।
রাজা ম্যানুয়েল ভাবলেন, স্পেনীয় প্রতিযোগিরা যাতে পর্তুগালকে ছাড়িয়ে যাচ্ছে।, সেজন্য রাজা পর্তুগাল থেকেও অভিযানের ব্যবস্থা করলেন। যাতে পূর্ব দিকে ভারতবর্ষের সমুদ্র পথ আবিষ্কার করা সম্ভব হয়। এই অভিযানের নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য রাজা ম্যানুয়েল ‘ভাস্কো-দ্য-গামা’ নামের এক নাবিককে পছন্দ করেন।
কিভাবে এল সমুদ্রের তলদেশে ৩ হাজার বছরের পুরনো জাহাজ

ভাস্কো-দ্য-গামার ঐতিহাসিক যাত্রা শুরু
৪ টি জাহাজে ১৭০ জন লোক। সময়কাল ১৪৯৭ সালের ৪ঠা জুলাই। ভাস্কো-দ্য-গামা তাঁর যাত্রা শুরু করেন। প্রত্যেক জাহাজে বন্দুক, তীর-ধনুক, বর্শা, পাইক ও জেভেলিনের মতো পর্যাপ্ত অস্ত্রশস্ত্র ছিল। প্রচুর দর্শক বন্দরে এসে এই সাহসী বীরদের শুভযাত্রার মাধ্যমে বিদায় জানান। তাদের আশা নাবিকেরা পর্তুগালের জন্য সম্মান ও সম্পদ নিয়ে আসবে। ভাস্কো-দ্য-গামা আগের অভিযাত্রীদের মতো আফ্রিকার উপকূল ঘেঁষে না গিয়ে, কিছুটা দূর দিয়ে আটলান্টিকের মধ্য দিয়ে অগ্রসর হন।
এতে বাতাসের বেগ ও সমুদ্র স্রোত প্রবল থাকায় জাহাজের গতি বেড়ে যায়। যা পরবর্তীকালে ইউরোপ হতে আফ্রিকার সর্ব দক্ষিণ প্রান্তে যাওয়ার সর্বাধিক প্রচলিত পথ হিসেবে চিহ্নিত হয়। যাত্রার ৫ মাস পর গামার জাহাজ উত্তমাশা অন্তরীপ দিয়ে আফ্রিকার সর্বদক্ষিণ প্রান্ত অতিক্রম করে। পূর্ব উপকূল ধরে ভারতবর্ষের দিকে চলতে থাকে।
জীবনের ২৯ বছর সময় একটানা ভ্রমন করেছেন ইবনে বতুতা

মোজাম্বিক ও কেনিয়া সফর
ভারতবর্ষে যাওয়ার পথে ভাস্কো-দ্য-গামা কিছু ফলের দেখা পান। যা তিনি জীবনে কখনো দেখেননি। যেমন তরমুজ, শশা ও নারকেল। চলতে চলতে তিনি আফ্রিকার দক্ষিণ-পূর্ব উপকূলে অবস্থিত মোজাম্বিকে গিয়ে উপস্থিত হন। সেখানে তিনি নৌ-বিদ্যায় পারদর্শী ও বিচক্ষণ কিছু নৌ-ক্যাপ্টেনের দেখা পান। কিছু চতুর বণিকদের দেখা পান। যাদের পরনে ছিল সুন্দর লিনেন, রেশম ও সিল্কের পোশাক। গামা, মোজাম্বিক থেকে উত্তরে মোম্বাসায় (বর্তমানে কেনিয়ায় অবস্থিত) আসেন। মোম্বাসা পার হয়ে তাঁর জাহাজ কেনিয়ারই অন্য একটি বন্দর ‘মালিন্দিতে’ পৌঁছায়।
ক্যালিকট বন্দরে আগমন ও রাজকীয় সাক্ষাৎ
মালিন্দিতে গামা একজন অভিজ্ঞ ক্যাপ্টেন পেয়ে যান। যিনি ভাস্কো-দ্য-গামা কে ভারত মহাসাগর পার হতে সাহায্য করেন। ১৪৯৮ সালের ২০ মে তারিখে এক রোদ ঝলমল দিন। ভাস্কো-দ্য-গামা ভারতের তৎকালীন প্রসিদ্ধ ক্যালিকট (বর্তমানে কোজিকোরে) বন্দরে নোঙ্গর করেন। তিনি সেখানে একটি ‘পাদরাও’ (স্মারক স্তম্ভ) পুঁতে প্রমাণ করেন যে, শেষ পর্যন্ত তিনি এত দূর এসেছিলেন। সে সময় ক্যালিকটের স্থানীয় হিন্দু রাজা ছিলেন। যাঁকে ‘জামোরিন’ নামে ডাকা হতো। তিনি পর্তুগীজ অভিযাত্রীদের অভিনন্দন জানান।
কিভাবে কাপে এল আপনার প্রিয় কফি

উপহার বিতর্ক ও চুক্তি বাতিল
গামার মূল ইচ্ছা ছিল হিন্দু রাজার সাথে একটি বাণিজ্য চুক্তি সম্পাদন করা। তিনি রাজা ম্যানুয়েল কর্তৃক বাণিজ্য চুক্তি সম্পাদনের অনুরোধ সম্বলিত একটি পত্র রাজার কাছে উপস্থাপন করেন। সাথে আনা কিছু উপহার রাজাকে প্রদান করেন।
কিন্তু উপহারগুলোর মধ্যে ছিল মূলত সস্তা চটকদার কাপড়, পরিচ্ছদ এবং কোরাল ও কাঁচের তৈরি পুঁতির অলংকার। অথচ রাজার কাছে আসা অন্যান্য বণিকেরা সাধারণত সোনাদানাসহ মূল্যবান উপহার দিতেন। ফলস্বরূপ, গামার সস্তা উপহার দেখে রাজা ও তাঁর পারিষদবর্গ চরম অসম্মান বোধ করেন। রাজা জামোরিন, বাণিজ্য চুক্তির অনুরোধটি বাতিল করে গামাকে অবিলম্বে ক্যালিকট ছাড়ার আদেশ দেন।
কষ্টকর ফিরতি যাত্রা ও গামার অর্জন
ক্যালিকট থেকে মশলার এক বড় চালান নেন গামা। ভারত মহাসাগর হয়ে দেশের উদ্দেশ্যে ফিরতি পথ ধরেন। তবে দেশে ফেরার এই যাত্রা ছিল অত্যন্ত কঠিন ও কষ্টকর। ভিটামিন সি’র অভাবে ‘স্কার্ভি’ রোগে আক্রান্ত হয়ে তাঁর সাথে থাকা অর্ধেক লোকই মারা যান।
এতে করে জাহাজে লোকবলের তীব্র অভাব দেখা দেয়। বাধ্য হয়ে গামা একটি জাহাজ পুড়িয়ে দেন। অবশেষে ১৪৯৯ সালের জুলাই মাসের ১০ তারিখ। দীর্ঘ ২ বছর পর গামা পর্তুগালে পৌঁছান। ভারতবর্ষের এই সফল অভিযানে রাজা ম্যানুয়েল খুশি হন। গামাকে দুটি পেনশন মঞ্জুর করেন এবং ‘ডোম’ ও ‘এ্যাডমিরাল’ খেতাবে ভূষিত করেন। এর পর গামা ভারতবর্ষে আরও দুটি অভিযান পরিচালনা করেন। সেটা ছিল ১৫০২ ও ১৫২৪ সাল। ১৫২৪ সালে অভিযানের সময় তিনি ভারতে অসুস্থ হন এবং মারা যান।
ভিডিওতে দেখুন অদ্ভুত এক সামুদ্রিক জাতি

ইউরোপীয় নৌ-বাণিজ্যে নতুন যুগের সূচনা
প্রিন্স হেনরি দি নেভিগেটর, বার্থলোমিউ দিয়াজ এবং ভাস্কো-দ্য-গামার অক্লান্ত প্রচেষ্টায় ইউরোপে নৌ-পথ অভিযানের এক নতুন জোয়ার সৃষ্টি হয়। দিয়াজ কর্তৃক আফ্রিকার দক্ষিণ প্রান্ত আবিষ্কার এবং গামার ভারতবর্ষের অভিযান প্রমাণ করে যে, আফ্রিকা ঘুরে ভারত পর্যন্ত সমুদ্র পথ তৈরি করা সম্ভব।
তাঁদের এই আবিষ্কার ইউরোপে ব্যপক সাড়া ফেলে। ইউরোপীয় দেশগুলোর মধ্যে নতুন পথ আবিষ্কার ও স্থান দখলের তীব্র প্রতিযোগিতা শুরু হয়ে যায়। পরবর্তীতে পর্তুগালের প্রতিবেশী দেশ ফ্রান্স ভারতের সাথে বাণিজ্য করার উদ্দেশ্যে অচিরেই পর্তুগালের অন্যতম প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে ওঠে।
লেখক – সেলিম হোসেন – তাং – ০৮/০৭/২০২৬ ইং – প্রতীকী ছবি গুলো এআই জেনারেটেড।

