ইবনে বতুতার বিশ্ব ভ্রমণ : মধ্যযুগীয় দুনিয়াকে দেখার এক অনন্য জানলা

ইবনে বতুতার বিশ্ব ভ্রমণ

ইবনে বতুতা : বিস্ময়কর ভ্রমণ কাহিনী ও ‘রিহলা’

ইবনে বতুতা ছিলেন মরক্কোর তাঞ্জিয়ারের অধিবাসী। তিনি তাঞ্জিয়ারে ২৪ ফেব্রুয়ারি ১৩০৪ সালে জন্মগ্রহণ করেন। মধ্যযুগে তিনি ছিলেন মুসলমানদের মধ্যে তথা সারা পৃথিবীর সর্বকালের শ্রেষ্ঠ পর্যটক। তিনি ৩০ বছর দেশ ভ্রমণ করে ‘রিহলা’ বা ইবনে বতুতার ভ্রমণ-১৩৫৫ নামের একটি বই লেখেন।

পরবর্তী যাত্রী-অভিযাত্রীদের জন্য এই বই মহামূল্যবান হিসেবে বিবেচিত হয়েছে। তিনি ৭৫ হাজার মাইল (১,২০,০০০ কিমি) পথ পরিভ্রমণ করেছিলেন। তার ভ্রমন ছিল এশিয়া, আফ্রিকা এবং ইউরোপ মহাদেশ পর্যন্ত  বিস্তৃত। তখনকার মুসলিম দুনিয়ার দেশগুলোতেই বেশী ভ্রমন করেছিলেন। সুদূর ইন্দোনেশিয়া এবং চীন পর্যন্ত গিয়েছিলেন।

ইবনে বতুতা এমন এক মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। যেখানে বেশ কিছু মুসলিম কাজী (বিচারক) জন্মেছিলেন। এজন্য তিনি তাঞ্জিয়ারে আইন ও বিচার বিষয়ক শিক্ষা গ্রহণ করেছিলেন। সাহিত্যেও তিনি জ্ঞান অর্জন করেন। ১৩২৫ সালে যখন তাঁর বয়স ২১ বছর, তখন তিনি পবিত্র হজ্জ পালনে উদ্যোগী হন। একটি কাফেলার সাথে নীল নদের পাড় ধরে মক্কার উদ্দেশ্যে যাত্রা করেন।

প্রাথমিকভাবে তাঁর উদ্দেশ্য ছিল ধর্মীয় কর্তব্য পালন করা। পরে, নিজের শিক্ষা ও জ্ঞানকে আরো সমৃদ্ধ করতে মিশর, সিরিয়া এবং হেজাজের (পশ্চিম আরব) বিখ্যাত জ্ঞানীদের সংস্পর্শে আসার পরিকল্পনা তাঁর ছিল।

যেভাবে আমেরিকার সেরা প্রেসিডেন্ট হলেন আব্রাহাম লিঙ্কন 

ইবনে বতুতার বিশ্ব ভ্রমণ
ইবনে বতুতার বিশ্ব ভ্রমণ

ইবনে বতুতার জ্ঞানচর্চা ও সম্মাননা

তিনি অনেক মুসলিম মনীষী, সুফিদের সংস্পর্শে আসেন। সকলেই তাঁর শিক্ষা, সংস্কৃতি ও জ্ঞানের প্রভূত প্রশংসা করেন। এর ফলে ভ্রমণকালে অনেক দেশের অনেক কোর্ট, কাচারি, আদালতে তিনি সম্মানিত অতিথি বিচারক হিসেবে বিচার করার দায়িত্ব প্রাপ্ত হয়েছিলেন। তিউনিশ এবং ত্রিপোলি হয়ে যখন তিনি মিশরে যান তখন ভ্রমণের প্রতি তাঁর অপ্রতিরোধ্য পিপাসা জেগে ওঠে। তিনি পরিকল্পনা করলেন, যতটা সম্ভব পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে সফর তিনি করবেন।

তিনি একটা নিয়ম অনুসরণ শুরু করলেন। আর তা হচ্ছে কোনো পথে দ্বিতীয়বার ভ্রমণ করা যাবে না। সেই সময়ে যারা ভ্রমণ করতেন, তাঁদের প্রায় সবারই উদ্দেশ্য থাকত ব্যবসা-বাণিজ্য, তীর্থযাত্রা অথবা শিক্ষা লাভ করা। কিন্তু বতুতার উদ্দেশ্য ছিল জ্ঞান আহরণ করা। নতুন দেশ ও মানুষ সম্বন্ধে জানা। যেখানেই তিনি যেতেন, তাঁর অগাধ জ্ঞান-অভিজ্ঞতা এবং ভ্রমণ-খ্যাতির জন্য তিনি আদৃত হতেন।

যে সব দেশে তিনি ভ্রমণ করেছেন তার সবখানেই রাজা, সুলতান, গভর্নর, উচ্চ পদস্থ কর্মকর্তাদের আতিথ্য তিনি লাভ করেছেন। ফলে, কোথাও কোথাও পুরস্কার, উপঢৌকন। অনেক রাজা, সুলতান তাকে প্রচুর অর্থ সাহায্য করতেন। নিজের সাথের পুঁজি অক্ষত থাকত এবং তা পরবর্তী ভ্রমণে সহায়ক হত।

যে ভয়ঙ্কর ঘটনা ঘটেছিল কারবালার পরে 

ইবনে বতুতার বিশ্ব ভ্রমণ
ইবনে বতুতার বিশ্ব ভ্রমণ

মক্কা, আরব ও আফ্রিকা সফর

কায়রো হতে উত্তর মিশর অঞ্চল দিয়ে বতুতা লোহিত সাগর পার হতে চেয়েছিলেন। কিন্তু সে পরিকল্পনা বাদ দিয়ে তিনি সিরিয়া ভ্রমণ করেন। সিরিয়া হতে এক ক্যারাভ্যানের (কাফেলা, দলবদ্ধ পর্যটক, তীর্থযাত্রী) সাথে তিনি মক্কা যাত্রা করেন। ১৩২৬ সালে হজ্জব্রত পালনের পর আরবের মরুভূমি পার হয়ে তিনি ইরাক, দক্ষিণ ইরান, বাগদাদ ও আজারবাইজান সফর করেন।

ইরানে তাঁর সাথে শেষ মঙ্গল খান আবু সাঈদের দেখা হয়। ১৩২৭ হতে ১৩৩০ সাল পর্যন্ত ৩ বছরে মক্কা-মদিনায় তিনি নির্জন সাধকের জীবন যাপন করেন। কিন্তু এত দীর্ঘ কাল এক স্থানে থাকা তাঁর ধাতে সইছিল না। জেদ্দা হতে কিছু সমর্থক ও সহযাত্রী নিয়ে লোহিত সাগরের উভয় তীর দেখতে দেখতে তিনি ইয়েমেনে পৌঁছান।

ইয়েমেন হতে স্থলপথে এডেন আসেন। এডেন হতে নৌকা পথে তিনি পূর্ব আফ্রিকার বাণিজ্য শহর তাঞ্জানিয়া (কিলোয়া) পৌঁছান। এখান হতে ফেরৎ যাত্রায় তিনি আরবের দক্ষিণাংশ, ওমান, হরমুজ, পারস্যের দক্ষিণাংশ এবং পারস্য উপসাগর পার হয়ে ১৩৩২ সালে পুনরায় মক্কায় ফেরেন।

প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব কেমন হওয়া উচিত 

ইবনে বতুতার বিশ্ব ভ্রমণ
ইবনে বতুতার বিশ্ব ভ্রমণ

তুর্কি অঞ্চল ও মধ্য এশিয়া ভ্রমণ

এদিকে বতুতার মাথায় নতুন এক পরিকল্পনা আসে। এ সময় দিল্লির সুলতান মুহম্মদ-বিন-তুঘলকের (১৩২৫-৫১) নাম তিনি শুনেছিলেন। মুসলিম সাধক, সুফি, দরবেশ এবং পর্যটকদের প্রতি তাঁর সহানুভূতি এবং সহায়তার কথাও শুনেছিলেন। ইবনে বতুতা তুঘলকের দরবারে যাওয়ার ইচ্ছা করেন। দিল্লি যাওয়ার সুবিধাজনক কোনো পথ খুঁজে না পেয়ে, বতুতা পুনরায় মিশর ও সিরিয়া পার হয়ে লতাকিয়াতে আসেন।

এখান হতে তিনি এশিয়া মাইনরের আনাতোলিয়ার উদ্দেশ্যে জাহাজে চাপেন। তুর্কিদের দেশ আনাতোলিয়া অঞ্চলে তখন অনেক সুলতান রাজত্ব করতেন। তুর্কি দেশ পার হতে তাঁর বেশ কিছুদিন লাগে। সে সময়ের সেলজুক তুর্কিদের সময় হতে ওসমানীয় তুর্কিদের সময় পর্যন্ত অনেক অনেক বিষয়ের মূল্যবান বর্ণনা বতুতার ভ্রমণ কথায় পাওয়া যায়।

তুর্কিদের দেশে ইবনে বতুতা যেখানে গেছেন সেখানেই সম্মান ও আন্তরিক আতিথেয়তা পেয়েছেন। এখনকার ইস্তাম্বুল যা আগে কনস্টান্টিনোপল নামে বাইজেন্টাইনদের রাজধানী ছিল, সেখানে তিনি অনেক কিছু দেখেছিলেন। বাইজেন্টাইন বা পূর্ব রোম সাম্রাজ্য সম্বন্ধে ইবনে বতুতার বিবরণ ইতিহাসের মূল্যবান দলিল। কনস্টান্টিনোপল হতে কৃষ্ণ সাগর দিয়ে ক্রিমিয়া পার হয়ে তিনি রাশিয়ায় আসেন।

এখান হতে পর্যটকদের এক ক্যারাভ্যানের সাথে বতুতা মধ্য এশিয়ার বুখারা, সমরখন্দ এবং বলখ পর্যন্ত যান। খোরাসান হতে আফগানিস্তানে যেতে অনিবার্য কারণে তিনি জটিল পথ ধরেন। এর পর হিন্দুকুশ পর্বতশ্রেণি পার হয়ে বতুতা ভারত বর্ষের সিন্ধু নদীর তীরে ১২ সেপ্টেম্বর, ১৩৩৩ সালে এসে পৌঁছান। সময়ের এই হিসাব অবশ্য অনেকে মেনে নিতে পারেনননি। ১৩৩৩ সালের বদলে অনেকে একে আরো কয়েক বছর পরে বলে মনে করেন।

কেন শিখ সুন্দরী তালাক দিলেন মুসলিম স্বামীকে 

ইবনে বতুতার বিশ্ব ভ্রমণ
ইবনে বতুতার বিশ্ব ভ্রমণ

দিল্লিতে ইবনে বতুতা

ভারতে পৌঁছার সময় বতুতার সাথে অনেক সমর্থক এবং তাঁর পরিবার পরিজন ছিলেন। দিল্লির সুলতান মুহম্মদ-বিন-তুঘলক বতুতাকে সহৃদয়তার সাথে গ্রহণ ছিলেন। বতুতা দিল্লিতে এসে তুঘলকের অর্থ-বিত্তের বৈভব দেখে অবাক হয়ে যান।

বতুতাকে বহুমূল্য উপহার-উপঢোকনাদি প্রদান করা হয়। দিল্লির গ্র্যান্ড কাজী হিসেবেও বতুতা কয়েক বছর কাজ করেন। সুলতান মুহাম্মদ-বিন-তুঘলক মানুষ হিসেবে উদার ছিলেন। তবে তিনি গুজব প্রচুর শুনতেন। কেউ বন্ধু থাকলে যে কোনো সময় সে বন্ধু সুলতানের রোষানলে পড়তে পারতেন।

বিভিন্ন দল, মত ও লোকজনের কুপরামর্শে কখন সুলতান বতুতার উপর অপ্রসন্ন হয়ে পড়বেন তার ঠিক-ঠিকানা ছিল না। এমনভাবে চলতে চলতে এক সময় ঠিকই বতুতা সুলতানের কুনজরে পড়ে যান। কিন্তু আল্লাহর অশেষ অনুগ্রহে এর অবসান ঘটে এবং এরপর বতুতাকে চীন সম্রাটের দরবারে সুলতানের প্রতিনিধি হিসেবে ১৩৪২ সালে নিয়োগ করা হয়।

যে ঘটনা জেনে চমকে উঠবেন, ভুলবিচারে কুদ্দুসের ফাঁসি

ইবনে বতুতার বিশ্ব ভ্রমণ
ইবনে বতুতার বিশ্ব ভ্রমণ

বিপদসংকুল যাত্রা ও জাহাজডুবি

খুশি মনে বতুতা দিল্লি ছাড়লেও পরবর্তী যাত্রাপথ তাঁর নিরাপদ ছিল না। দিল্লির কিছুদূর পরেই অমুসলিম দুষ্কৃতিকারীরা তাঁকে আক্রমণ করে। অনেক কষ্টে জীবন বাঁচিয়ে তিনি ভারতের দক্ষিণে যান এবং মালাবার উপকূলে স্থানীয়দের সাথে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েন।

শেষ পর্যন্ত কালিকট বন্দরের (বর্তমানে কোঝিকোড়) নিকট তাঁর জাহাজ ডুবি ঘটে। তাঁর সমস্ত সম্পদ এবং চীন সম্রাটের জন্য সুলতানের পাঠানো সকল উপহারাদি হারিয়ে বতুতা দিল্লি ফিরে যেতে সাহস পেলেন না।

তিনি মালদ্বীপ পুঞ্জের দিকে যেতে থাকেন। সেখানে তিনি ২ বছর বাস করেন। কাজী হিসেবে তিনি প্রথমে এখানে নিয়োগ পান। পরে স্থানীয় রাজনীতিতে সক্রিয় হয়ে পড়েন, স্থানীয় রাজপরিবারে বিয়ে করেন এবং সুলতান হওয়ার জন্য নিজেকে প্রস্তুত করতে থাকেন।

মালদ্বীপ, শ্রীলঙ্কা ও চীন সফর

মালদ্বীপে ইবনে বতুতা রাজকর্মচারীদের ষড়যন্ত্রে বিপাকে পরেন। একারনে সেখান থেকে শ্রীলঙ্কায় চলে যান। সেখান হতে বাংলাদেশ এবং আসামে যান। এখান হতে চীন যাওয়ার অভিপ্রায়ে ইন্দোনেশিয়ার সুমাত্রার উদ্দেশ্যে রওয়ানা হন বতুতা। সুমাত্রার মুসলিম সুলতান বতুতাকে একটি জাহাজ দিলে ঐ জাহাজে করে বতুতা চীনের দিক রওয়ানা হন।

চীনের জে-তুন বন্দরে বতুতার জাহাজ নোঙর করে। এরপর অভ্যন্তরীণ নৌপথে তিনি বেইজিং পর্যন্ত গমন করেন এবং সেখান হতে ফেরত আসেন। এভাবে চীন পর্যন্ত বতুতার সফর শেষ হয়। ১৩৪৯ সালের নভেম্বরে বতুতা দেশে ফিরে আসেন।

সাউথ আফ্রিকায় খুনিদের হাত থেকে যেভাবে বাঁচলেন ভ্রমন ব্লগার ওয়াকফি 

ইবনে বতুতার বিশ্ব ভ্রমণ
ইবনে বতুতার বিশ্ব ভ্রমণ

শেষ জীবন ও মৃত্যু

এরপর বতুতা আইবেরীয় যোজকের পাশে দুটি মুসলিম দেশ সফর করেন। এর একটা হলো স্পেনীয় মুর-শাসিত শেষ মুসলিম দেশ গ্রানাডা (১৩৫০ সালে)। অন্যটি হচ্ছে ১৩৫২ সালে দক্ষিণ সুদান। ১৩৫৩ সালের শেষের দিকে বতুতা মরক্কো ফিরে আসেন।

২৪ বছর পর ১৩৭৭ সালে ৭৩ বছর বয়সে তিনি তাঞ্জিয়ারে মারা যান। সে সময়ে যাতায়াত যোগাযোগের রাস্তা সুবিধার ছিল না। যান বাহন এবং জলপথে চলার নৌকা-জাহাজের সংকট ছিল। এত কিছু প্রতিকূলতার মধ্যে ইবনে বতুতা ৩০ বছরে ৭৫ হাজার মাইল পথ চলাচল করতে পেরেছিলেন। এই পথের অধিকাংশই ছিল সমুদ্র বা নদী পথ।

লেখক – সেলিম হোসেন – তাং – ০৮/০৫/২০২৬ ইং – প্রতীকী ছবি গুলো এআই জেনারেটেড।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *