সম্পদ ও সুখের সম্পর্ক: কর্পোরেট বসের অসুখী হওয়ার গল্প।

সম্পদ ও সুখের সম্পর্ক

সম্পদ ও সুখের সম্পর্ক বিজ্ঞান ও ইসলামের দৃষ্টিতে

সাফল্যের প্রতিযোগিতায় চলছে বিরামহীন দৌড়। আপনি ছুটছেন, আপনার গাড়ি লাগবে, বাড়ি লাগবে। ছেলে মেয়েরা পড়বে দামি স্কুলে। স্ত্রীর নিত্যনতুন ফ্যাশনের ড্রেস দরকার। আপনি ভাবছেন এগুলো হলেই আপনি সুখী হবেন। যত বেশি সম্পদ হবে, তত বেশি সুখী হবেন। কিন্তু গবেষণার ফলাফল বলছে ভিন্ন কথা।

সম্পদ কি স্বাস্থ্যের মতো?

মনোবিজ্ঞানী মায়ার্স (Myers) একটি চমৎকার উদাহরণ দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, সম্পদ অনেকটা স্বাস্থ্যের মতো। স্বাস্থ্য না থাকলে যেমন আপনি কষ্টে থাকবেন। তেমনি চরম দারিদ্র্য মানুষের জীবনে দুর্দশা বয়ে আনে। কিন্তু শরীর সুস্থ থাকলেই যেমন আপনি পরম সুখী হবেন এমন কোনো গ্যারান্টি নেই। তেমনি শুধু সম্পদ থাকলেই সুখের নিশ্চয়তা পাওয়া যায় না।

সম্পদ ও সুখের সম্পর্ক গবেষণার চমকপ্রদ ফলাফল

আমেরিকার একটি গবেষণায় দেখা গেছে, ১৯৫৭ থেকে ২০০৪ সালের মধ্যে মানুষের আয় কয়েক গুণ বেড়েছে। কিন্ত সুখের হার বাড়েনি। উল্টো দেখা গেছে, উন্নত দেশগুলোতে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি বাড়ার সাথে সাথে অপরাধ, ডিপ্রেশন এবং বিবাহ বিচ্ছেদের হারও বেড়েছে। অর্থাৎ, বাহ্যিক চাকচিক্য মনের শান্তি নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হয়েছে।

পরিবারে সুখের চাবিকাঠি 

সম্পদ ও সুখের সম্পর্ক
সম্পদ ও সুখের সম্পর্ক

সম্পদ ও সুখের সম্পর্কের ভারসাম্য 

গবেষণা বলছে, যারা শুধু ক্ষমতা বা লোক দেখানোর জন্য সম্পদ জমায়, তাদের মানসিক স্বাস্থ্যের ক্ষতি হওয়ার সম্ভাবনা বেশি। এর বিপরীতে, যারা তাদের বর্তমান প্রাপ্তি নিয়ে সন্তুষ্ট থাকে এবং কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে, তারাই বেশি সুখী হয়।

ইসলাম ও আধুনিক বিজ্ঞানের মেলবন্ধন

আধুনিক বিজ্ঞান আজ যা প্রমাণ করছে, ইসলাম তা শত শত বছর আগেই আমাদের শিখিয়েছে। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তায়ালা বারবার কৃতজ্ঞতা বা ‘শুকরিয়া’ আদায়ের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। যখন মানুষ তার প্রাপ্ত নিয়ামতের জন্য আল্লাহর কাছে কৃতজ্ঞ থাকে, তখন তার মনের অস্থিরতা দূর হয় এবং প্রকৃত সুখ অর্জিত হয়।

মাহফুজ সাহেব একটি মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানির রিজিওনাল হেড। ঝকঝকে এসি অফিস, পাজেরো গাড়ি আর উচ্চ বেতনের চাকরি। দেখলে মনে হয় তিনি বিশ্বের সবচেয়ে সুখী মানুষ। কিন্তু তার দিন কাটে ল্যাপটপের স্ক্রিনে, আর রাত কাটে পরের দিনের প্রেজেন্টেশনের দুশ্চিন্তায়।

একদিন মাহফুজ সাহেব তার অফিসের এক পুরনো পিয়নের ডেস্কে গিয়ে বসলেন। দেখলেন, পিয়নটি একটি ছোট টিফিন বক্স খুলে পরম তৃপ্তিতে তার দুপুরের খাবার খাচ্ছে। ফোনে তার মেয়ের সাথে হাসিমুখে কথা বলছে। কাজ শেষে সে ঠিক সময়ে ব্যাগ গুছিয়ে বাড়ির দিকে রওনা দেয়।

মাহফুজ সাহেব একদিন তাকে ডেকে জিজ্ঞেস করলেন, “রহমত, তোমার বেতন তো অনেক কম। তবুও তোমাকে সবসময় এত খুশি দেখা যায় কীভাবে? আমার তো এত কিছু আছে, তবুও সারাক্ষণ মাথায় টেনশন কাজ করে।”

রহমত বিনয়ের সাথে হাসল এবং উত্তর দিল:

“স্যার, আপনার কাছে যা আছে তা হলো ‘টার্গেট’, আর আমার কাছে যা আছে তা হলো ‘তৃপ্তি’। আপনি বড় পদের পেছনে ছুটছেন যাতে ভবিষ্যতে আরও ভালো থাকতে পারেন। আর আমি আমার বর্তমান সময়টাকে সুন্দর করার চেষ্টা করি। আমি জানি আমার চাহিদা কম, তাই আমার অল্প প্রাপ্তিতেই আমি রাজা।”

কেন আপনি দুঃখের গোলামী করছেন দেখুন ভিডিও 

সম্পদ ও সুখের সম্পর্ক
সম্পদ ও সুখের সম্পর্ক

আরিফ সাহেব সেদিন বুঝতে পারলেন, তিনি আসলে সম্পদের পেছনে ছুটতে গিয়ে নিজের বর্তমান মুহূর্তগুলোকেই হারিয়ে ফেলেছেন। তিনি বুঝলেন, সফল হওয়া মানেই সুখী হওয়া নয়, বরং নিজের ভেতর প্রশান্তি বজায় রাখাই হলো আসল সাফল্য।

উপসংহার 

জীবনে অনেক টাকা কামিয়েছেন। নিজ কর্মে সফল হয়েছেন। কিন্ত বেড়ে গেছে কর্টিসল (Cortisol), স্ট্রেসের যন্ত্রণায় ঘুম ধরে না। স্ত্রীর প্রতি আকর্ষণ বোধ করেন না। কারন আপনার স্ট্রেস হরমোনের মাত্রা অনেক বেশী। গবেষণায় দেখা গেছে, যারা অতিরিক্ত উচ্চাকাঙ্ক্ষী এবং কেবল বস্তুগত সাফল্যের পেছনে ছোটে, তাদের স্ট্রেস হরমোনের মাত্রা অন্যদের চেয়ে অনেক বেশি থাকে।

গল্পের রহমতের মতো যারা ‘কৃতজ্ঞ’ থাকতে জানে, তারাই আসলে দীর্ঘমেয়াদে সুখী হয়।

লেখক – সেলিম হোসেন – তাং – ০১/০৪/২০২৬ ইং – প্রতীকী ছবি গুলো এআই জেনারেটেড।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *