বাবা মা দুজনেই কর্মজীবী। ভীষণ ব্যস্ত। যে কারনে বাড়ছে সন্তানদের সাথে দূরত্ব। সন্তানেরা একা হয়ে পরছে। দক্ষিণ কোরিয়ার ‘হিকিকোমোরি’ সমস্যার আলোকে আধুনিক প্যারেন্টিং নিয়ে আমাদের আজকের বিশ্লেষণ। জেনে নিন প্যারেন্টিং টিপস, সন্তানের একাকিত্ব দূর করার উপায়।
প্যারেন্টিং টিপস – ব্যস্ত বাবা-মা ও সন্তানের নিঃশব্দ দূরত্বের গল্প
বাবা-মা ও সন্তানের সম্পর্ক মানেই এক অমোঘ মায়াজাল। এক পরম নির্ভরতা। কিন্তু বর্তমান সময়ে আমাদের জীবনধারা বদলে গেছে। তাই সম্পর্কের সমীকরণও অনেকটা বদলে গেছে। ক্যারিয়ারের ইঁদুর দৌড়ে বাবা-মা দুজনেই এখন কর্মব্যস্ত। অন্যদিকে, চার দেয়ালের মাঝে বড় হওয়া সন্তানরা ক্রমশ নিজেদের গুটিয়ে নিচ্ছে এক অদৃশ্য খোলসে।
সম্প্রতি বিবিসি-র এক প্রতিবেদনে দক্ষিণ কোরিয়ার এক অদ্ভুত অথচ শিক্ষণীয় উদ্যোগের কথা উঠে এসেছে। সেখানে অনেক বাবা-মা স্বেচ্ছায় নিজেদের ‘নির্জন কক্ষে’ বন্দি করছেন। কেন? কারণ তাদের সন্তানরা সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে ঘরের কোণে নিজেদের আটকে রেখেছে। এই অবস্থাকে বলা হচ্ছে ‘হিকিকোমোরি’।
হিকিকোমোরি: যখন ঘরই হয় কারাগার
জাপানে প্রথম এই শব্দটি ব্যবহৃত হয় ১৯৯০-এর দশকে। যে শিশু কিশোররা সমাজ থেকে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন হয়ে পরেছে, তাদেরকে বলা হয় ‘হিকিকোমোরি’। দক্ষিণ কোরিয়ায় এ নিয়ে একটি জরিপ হয়েছে। সেখানে দেখা গেছে, বর্তমানে প্রায় ৫ লাখ ৪০ হাজার তরুণ তরুণী এই সমস্যায় ভুগছে। তারা না যায় স্কুল-কলেজে, না মেশে বন্ধু-বান্ধবের সাথে।
ছোট বেলার অবহেলা দাম্পত্য জীবনে বিরাট সমস্যার তৈরি করতে পারে

কেন সন্তানরা নিজেকে লুকিয়ে ফেলছে?
দক্ষিণ কোরিয়ার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের মতে, এর পেছনে রয়েছে কিছু গভীর কারণ:
-
বেকারত্ব ও ক্যারিয়ারের চাপ: শীর্ষ বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার বা বড় লক্ষ্য অর্জনের সামাজিক চাপ।
-
পারিবারিক দূরত্ব: বাবা-মা দুজনেই চাকরি করায় সন্তানদের একাকী বেড়ে ওঠা।
-
আবেগের গরমিল: বাবা-মায়ের উচ্চ প্রত্যাশা যখন সন্তানের সামর্থ্যের সাথে মেলে না, তখন সন্তানরা নিজেদের ব্যর্থ মনে করে গুটিয়ে নেয়।
দক্ষিণ কোরিয়ার ‘সুখের কারখানা’ বা হ্যাপিনেস ফ্যাক্টরি
দক্ষিণ কোরিয়ার বাবা মায়েরা সন্তানদের মনের অবস্থা বোঝার চেষ্টা করছেন। তাই তারা ছোট ছোট নির্জন কক্ষে কয়েক দিন কাটাচ্ছেন। সেখানে নেই ফোন, নেই ল্যাপটপ। উদ্দেশ্য একটাই—একাকিত্বের স্বাদ নেওয়া। ‘সো জিনের’ মতো অনেক মা এখন বুঝতে পারছেন, তাদের সন্তানরা কেন কথা বলে না। জিনের ভাষায়, “চুপ থাকার মাধ্যমে সে আসলে নিজেকে রক্ষা করছে, কারণ কেউ তাকে বুঝতে চায় না।”
আধুনিক বিশ্বের মহামারি সমস্যা, ভালো থাকবেন যেভাবে

আমাদের বর্তমান প্রেক্ষাপট ও আধুনিক প্যারেন্টিং
আমাদের দেশেও চিত্রটি দেখা যাচ্ছে। ঢাকা শহরে তো আছেই, জেলা শহর এমনকি গ্রামেও কিছু পরিবারে এমন অবস্থা চলছে। আধুনিক বাবা-মায়েরা সন্তানদের হাতে দামী গ্যাজেট তুলে দিচ্ছেন। কিন্তু পর্যাপ্ত সময় দিতে পারছেন না। ফলে সন্তানরা রক্ত-মাংসের মানুষের চেয়ে স্ক্রিনের সাথে বেশি সখ্যতা গড়ে তুলছে।
কেমন হওয়া উচিত আধুনিক বাবা-মায়ের ভূমিকা?
১. শোনা শিখতে হবে: সন্তান কী বলতে চায় তা বিচার (Judge) না করে ধৈর্য ধরে শুনুন। আমরা ভাবী আমারাই বুঝি, ওরা ছোট ওরা কি বুঝে। মনোবিজ্ঞান বলে ছোটরাও বুঝে।
২. প্রত্যাশার চাপ কমানো: জিপিএ-৫ বা বড় চাকরিই জীবনের শেষ কথা নয়, এটি সন্তানকে বোঝাতে হবে। মনে রাখবেন, আপানার সন্তানও পৃথিবীতে ইউনিক বৈশিষ্ট নিয়ে এসেছে। সে তার সেরাটা দেখাতে সক্ষম।
৩. কোয়ালিটি টাইম: দিনের অন্তত এক ঘণ্টা ফোন দূরে রেখে সন্তানের সাথে গল্প করুন। বাসায় ঢুকে সোশ্যাল মিডিয়াকে বিদায় দিন।
৪. মানসিক স্বাস্থ্যকে গুরুত্ব দেওয়া: শারীরিক অসুস্থতার মতো মনের অসুখকেও স্বাভাবিকভাবে গ্রহণ করুন।
পরিশেষে: সন্তানকে সফল করার চেয়ে সুখী করার চেষ্টা করাটা বেশি জরুরি। মনে রাখবেন, আপনার একটু সময় আর সহমর্মিতা তাকে একাকিত্বের গভীর অন্ধকার থেকে ফিরিয়ে আনতে পারে।
আপনার কি মনে হয়, কর্মব্যস্ততা কি আমাদের সন্তানদের মানসিকভাবে একা করে দিচ্ছে? আপনার মতামত কমেন্টে জানান।
হিকিকিমোরি নিয়ে ফ্রান্স ২৪ ইংলিশের একটি ভিডিও দেখুন

লেখক – সেলিম হোসেন – তাং – ১৪-০১/২০২৬ ইং – প্রতীকী ছবি গুলো পেক্সেলস এবং এআই জেনারেটেটেড। তথ্য সুত্র – বিভিন্ন পত্রপত্রিকা।

