ইন্টারমিটেন্ট ফাস্টিং ও অটোফেজি: সুস্থ থাকার ৯টি জাদুকরী উপকারিতা
ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ কিংবা পেটে গ্যাসের মতো অসংক্রামক রোগগুলো আমাদের আজীবন ভোগায়। কিন্তু আপনি কি জানেন, আপনার শরীরের ভেতরেই এমন এক ব্যবস্থা আছে যা আপনাকে এই সব রোগ থেকে মুক্তি দিতে পারে? যার নাম অটোফেজি। আজীবন সুস্থ থাকতে ইন্টারমিটেন্ট ফাস্টিং এবং অটোফেজি সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা থাকা জরুরি।
অটোফেজি কী এবং কেন এটি প্রয়োজন?
অটোফেজি (Autophagy) শব্দটি এসেছে গ্রিক শব্দ ‘অটো’ (নিজে) এবং ‘ফেজি’ (খাওয়া) থেকে। এর অর্থ হলো ‘নিজেকে নিজে খাওয়া’। ২০১৬ সালে জাপানি বিজ্ঞানী ইয়োশিনোরি ওসুমি এই যুগান্তকারী আবিষ্কারের জন্য নোবেল পুরস্কার পান।
আমাদের শরীরের প্রতিটি কোষে একটি করে ডাস্টবিন থাকে, যার নাম লাইসোজোম। আমরা যখন সারাদিন খাবার খাই, কোষগুলো সেই খাবার হজমে ব্যস্ত থাকে এবং লাইসোজোমে বর্জ্য জমতে থাকে। দীর্ঘক্ষণ না খেয়ে থাকলে শরীর বাইরে থেকে শক্তি না পেয়ে কোষের ভেতরের জমে থাকা আবর্জনা ও রোগজীবাণু খেতে শুরু করে এবং সেগুলোকে নতুন কোষে রূপান্তর করে। এই প্রক্রিয়াই হলো অটোফেজি।
জেনে নিন – কিভাবে মন ভালো করবেন।

ইন্টারমিটেন্ট ফাস্টিং করার ৩টি পদ্ধতি
সুস্থ থাকতে এবং অটোফেজি সক্রিয় করতে আপনি ৩টি উপায়ে ফাস্টিং করতে পারেন:
- ইন্টারমিটেন্ট ফাস্টিং: দিনের একটি নির্দিষ্ট সময় (১৬, ১৮ বা ২০ ঘণ্টা) না খেয়ে থাকা। এই সময়ে ক্যালরিবিহীন পানীয় পান করা যায়।
- ড্রাই ফাস্টিং: পানি বা খাবার—কিছুই গ্রহণ না করে দীর্ঘ সময় থাকা।
- রোজা (সিয়াম): ধর্মীয় ও বৈজ্ঞানিক উভয় দিক থেকেই যা শরীরের জন্য অত্যন্ত কার্যকর।
টিপস: সহজভাবে শুরু করতে চাইলে রাতে ৭টার মধ্যে ডিনার শেষ করুন এবং পরদিন সকাল ১১টায় ব্রেকফাস্ট করুন। এতে সহজেই আপনার ১৬ ঘণ্টা ফাস্টিং হয়ে যাবে।
পড়ুন – যেভাবে সহজে ওজন কমাবেন এবং সুস্থ থাকবেন।

ইন্টারমিটেন্ট ফাস্টিং এর সময় কী খাবেন এবং কী বর্জন করবেন?
ফাস্টিং পিরিয়ড চলাকালীন শরীরের ইনসুলিন লেভেল নিয়ন্ত্রণে রাখা জরুরি।
-
বর্জন করুন: চিনি, শর্করা (ভাত, রুটি), প্রোটিন এবং ফ্যাট যুক্ত খাবার।
-
পান করতে পারেন: সাধারণ পানি, লেবু পানি, অ্যাপল সাইডার ভিনেগার মিশ্রিত পানি, পিঙ্ক সল্ট পানি, লাল চা বা গ্রিন টি।
-
ফাস্টিং শেষে: স্বাস্থ্যকর খাবার যেমন—সালাদ, ঘি দিয়ে পোচ করা ডিম বা বাদাম দিয়ে শুরু করুন। ডিনারে অল্প লাল চালের ভাত ও প্রচুর সবজি রাখতে পারেন।
জেনে নিন – কোন বদভ্যাস রাতের ঘুম নষ্ট করে।

ইন্টারমিটেন্ট ফাস্টিং ও অটোফেজির ৯টি উপকারিতা
ইন্টারমিটেন্ট ফাস্টিং কেবল ওজন কমায় না, বরং পুরো শরীরকে ভেতর থেকে পরিষ্কার করে। এর প্রধান উপকারিতাগুলো হলো:
১. হজম শক্তি বৃদ্ধি ও গ্যাস দূরীকরণ: পেটের গ্যাস দূর হয় এবং পরিপাকতন্ত্র উন্নত হয়।
২. স্মৃতিশক্তি বৃদ্ধি: দীর্ঘ সময় উপবাসে মস্তিষ্কের নতুন কোষ তৈরি হয়, যা স্মৃতিভ্রম রোধ করে।
৩. স্টেম সেল রিজার্ভ: ২০ ঘণ্টা ফাস্টিং করলে শরীরে নতুন কোষ তৈরির স্টেম সেল বৃদ্ধি পায়।
৪. ইনফ্লেমেশন বা প্রদাহ কমানো: শরীরের দীর্ঘস্থায়ী ব্যথা বা প্রদাহ কমাতে এটি দারুণ কার্যকর।
৫. পুরানো কোষ পরিষ্কার: অটোফেজির মাধ্যমে শরীর তার অকেজো কোষগুলো ঝেড়ে ফেলে নতুন কোষ তৈরি করে।
৬. অক্সিডেটিভ স্ট্রেস হ্রাস: শরীরের ফ্রি রেডিক্যাল কমিয়ে স্ট্রেস লেভেল নামিয়ে আনে।
৭. এন্টি-এজিং (যৌবন ধরে রাখা): ফাস্টিং এর সময় প্রচুর গ্রোথ হরমোন নিঃসৃত হয়, যা বয়সের ছাপ পড়তে দেয় না।
৮. ওজন নিয়ন্ত্রণ: শরীরের জমে থাকা চর্বি শক্তি হিসেবে ব্যবহৃত হয়, ফলে দ্রুত ওজন কমে।
৯. পরিপাকতন্ত্রের বিশ্রাম: জন্মের পর থেকে অবিরাম কাজ করা পরিপাকতন্ত্রকে প্রয়োজনীয় বিশ্রাম দেয় এই ফাস্টিং।
উপসংহার
তারুণ্য ধরে রাখতে এবং ওষুধ ছাড়াই সুস্থ থাকতে অটোফেজি হলো প্রকৃতির শ্রেষ্ঠ উপহার। প্রথম দিকে ১২-১৩ ঘণ্টা দিয়ে শুরু করুন, ধীরে ধীরে সময় বাড়ান। বিশেষ করে রোজার মাসে সেহরি ও ইফতারে অস্বাস্থ্যকর খাবার বর্জন করলে আপনি ফাস্টিংয়ের পূর্ণ সুফল পাবেন।
লিখেছেন: সেলিম হোসেন (২৩/০২/২০২৪) তথ্যসূত্র: ড. এরিক বার্গ, ড. জাহাঙ্গীর কবির, ড. মজিবুর রহমান, ড. জেসন ফাং এবং বিভিন্ন মেডিকেল জার্নাল।


