অবহেলায় মনে আবেগ তৈরি হয়। বিষয় টা শৈশবেই হতে পারে। যাকে বলা হয় ‘ আবেগীয় অবহেলা ‘। আপনার শৈশবে অবহেলার কষ্টে ভুগেছেন ? এখন দাম্পত্য জীবনে তার প্রভাব পরছে ? সেই একই দুঃখ বয়ে বেড়াচ্ছেন। তাহলে জেনে নিন ৫টি লক্ষণ এবং এর থেকে উত্তরণের পথ।
শৈশবের ‘আবেগীয় অবহেলা’ (CEN): দাম্পত্যে আপনার আচরণ কি শৈশবের প্রতিফলন?
আমরা অনেকেই বড় হই আর এক ধরনের শুন্যতা অনুভব করি। সব থেকেও যেন কী নেই ! কারো সাথে গভীরভাবে মিশতে গেলে মনে হয় দেয়াল দাঁড়িয়ে আছে। কিংবা ঝগড়া হলেই শামুকের মতো নিজের খোলসে ঢুকে পড়তে ইচ্ছে করে। আমরা ভাবি এটা হয়তো আমাদের স্বভাব। কিন্তু এর শিকড় লুকিয়ে থাকতে পারে অনেক গভীরে। আপনার শৈশবে।
একে মনোবিজ্ঞানের ভাষায় বলা হয় Childhood Emotional Neglect (CEN) বা শৈশবের আবেগীয় অবহেলা।
আবেগীয় অবহেলা আসলে কী?
ছোট বেলায় বাবা মা বেশ মারতেন। ঠিকমত খেতে দিতেন না। আবেগীয় অবহেলা মানে তা নয়। অনেক বাবা মাই সন্তানকে ভালো খাবার খাওয়ান। দামি জামাকাপড় পরান। নামী স্কুলে ভর্তি করে দেন। কিন্ত বাচ্চার ‘আবেগ’ বুঝতে ব্যর্থ হন। বাচ্চা যখন মন খারাপ করে থাকে বা ভয় পায়, তখন বাবা-মাকে সেটা খেয়াল করতে হয়। গুরুত্ব দিতে হয়, তা নাহলে বাচ্চা অবচেতনভাবে ধরে নেয়—তার অনুভূতির কোনো মূল্য নেই। সে নিজেকে ‘অদৃশ্য’ ভাবতে শুরু করে।
ক্ষতিকর কেমিক্যাল থেকে নিজে বাচুন, বাচ্চাদের বাঁচান

বড়বেলায় এর লক্ষণগুলো কী কী?
শৈশবের এই অবহেলা বড়বেলায় নানাভাবে আমাদের আচরণে প্রকাশ পায়। দেখুন আপনিও এই সমস্যা গুলো অনুভব করেন কি না ?
১. শূন্যতাবোধ: সবসময় মনে হয় “আমি কে?” বা “আমার জীবনের উদ্দেশ্য কী?”
২. প্রত্যাখ্যাত হওয়ার ভয়: কাউকে বিশ্বাস করতে ভয় পাওয়া, পাছে সে নিচু দেখায় বা ছেড়ে চলে যায়।
৩. নিজের প্রতি অবহেলা: অন্যদের প্রতি আপনি প্রচণ্ড মমতাবান। ভালোভাবে বাঁচতে ইচ্ছে করে, কিন্তু নিজের যত্নের বেলায় আপনি উদাসীন।
৪. অহেতুক অপরাধবোধ: মনে হওয়া যে আপনি অন্যের জন্য একটা ‘বোঝা’।
৫. যোগাযোগে সমস্যা: কোনো ঝামেলা হলেই নিজেকে গুটিয়ে নেওয়া নেন বা বিচ্ছিন্ন করে ফেলেন অন্যদের থেকে। অথবা দায়িত্বপ্রাপ্ত কোন কাজ থেকে।
৬. আত্মবিশ্বাসের অভাব: সবসময় নিজের দোষ খুঁজেন এবং মনে করেন যে আমাকে দিয়ে কিচ্ছু হবে না।
কেন এমন হয়?
মানুষের মস্তিষ্ক শৈশবেই সম্পর্কের একটি ‘স্ক্রিপ্ট’ বা পাণ্ডুলিপি তৈরি করে ফেলে। যদি ৬ বছর বয়সের আগে শিশু তার আবেগের সঠিক প্রতিধ্বনি না পায়, তবে সে বড়বেলায় আবেগ প্রকাশ করতে বা অন্যের আবেগ গ্রহণ করতে সমস্যায় পড়ে। অনেক সময় কর্মব্যস্ত বাবা-মা বা অসচেতন প্যারেন্টিং স্টাইলের কারণে এটি প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে চলতে থাকে।
নারী ও পুরুষের স্বভাবের পার্থক্য জানলে দাম্পত্যে শান্তি আসবে

উত্তরণের উপায়: নিজেকে ভালোবাসার প্রথম ধাপ
এই বৃত্ত থেকে বের হওয়া সম্ভব। এর জন্য প্রয়োজন কিছু সচেতন পদক্ষেপ:
-
সচেতনতা: প্রথমেই স্বীকার করে নেওয়া যে আপনার অনুভূতিগুলো গুরুত্বপূর্ণ। ছোটবেলায় আপনার আবেগের দাম দেওয়া হয়নি ঠিকই, কিন্তু এখন আপনি বড় হয়েছেন। আপনি নিজেই নিজের আবেগের যত্ন নিতে পারেন।
-
অনুভূতি প্রকাশ করা: নিজের আনন্দ, ভয়, রাগ বা দুঃখকে ধামাচাপা না দিয়ে প্রকাশ করতে শিখুন।
-
শোনা ও অনুভব করা: অন্যের কথা মনোযোগ দিয়ে শুনুন এবং নিজের অনুভূতিগুলোকে পূর্ণমাত্রায় অনুভব করার সুযোগ দিন।
-
প্রয়োজনে থেরাপি: যদি এই সমস্যাগুলো আপনার ব্যক্তিগত বা পেশাগত জীবনকে বাধাগ্রস্ত করে, তবে সাইকোথেরাপি চমৎকার কাজ করতে পারে।
শৈশবের অবহেলা বুঝতে বাবা মায়েরা কেটি মরটনের ভিডিও টি দেখতে পারেন

শেষ কথা: এপিকিউরাসের একটা কথা আমলে নিতে পারি। তিনি বলেছিলেন, “একা থাকাকে একাকিত্ব বলে না, সবার মাঝে থেকেও গুরুত্ব না পাওয়াকে একাকিত্ব বলে।” আপনার শৈশব যেমনই কাটুক না কেন, আজকের সচেতনতা আপনার আগামী দিনগুলোকে অনেক বেশি সহজ এবং আনন্দময় করে তুলতে পারে।
লেখক – সেলিম হোসেন – তাং ১২/০১/২০২৬ ইং – প্রতীকী ছবি গুলো পেক্সেলস থেকে নেয়া।
তথ্য সুত্র – ‘কাউন্সেলিং টেবিলের গল্প’ বইয়ের অংশবিশেষ।

