সুখী পরিবার: সন্তান না কি দাম্পত্য—কেন্দ্রবিন্দুতে কে?
বান্ধবী কেমন আছিস ? আর বলিস না, সন্তান জন্মের পূর্বে তবুও জীবন ছিল, এখন সব চলে গেছে সন্তানের পিছনে। আমার নিজের বলতে আর কিছুই নেই ! বান্ধবীদের এমন কথোপকথন আমরা শুনতে পাই। সমাজে মায়েরা তাদের পুরো অস্তিত্ব বিলিয়ে দেন সন্তানের পেছনে।
আপাতদৃষ্টিতে একে চরম ‘ত্যাগ’ মনে হয়। কিন্ত আড়ালে লুকিয়ে আছে এক গভীর মনস্তাত্ত্বিক ও পারিবারিক সংকট। ‘হিলিং দ্য এম্পটিনেস’ বইটির আলোকে আজ আমরা আলোচনা করব কেন অতিরিক্ত সন্তান-কেন্দ্রিকতা পরিবারের ভিত্তি দুর্বল করে দেয়।
১. ভুল ভালোবাসায় আমাদের পতন
পবিত্র কোরআনে (সূরা আত-তাওবা: ২৪) আল্লাহ তায়ালা আটটি প্রিয় জিনিসের তালিকা দিয়েছেন—যার মধ্যে বাবা-মা, সন্তান, স্ত্রী এবং সম্পদ রয়েছে। এগুলোকে ভালোবাসা মোটেও পাপ নয়। বরং এগুলো আমাদের জীবনের অংশ। কিন্তু সমস্যা তখনই শুরু হয়, যখন এই ভালোবাসা আল্লাহ এবং তাঁর রাসূলের চেয়ে বড় হয়ে যায়। আমরা যখন কোনো সৃষ্টিকে (যেমন: সন্তান) জীবনের একমাত্র ‘কেন্দ্রবিন্দু’ বানিয়ে ফেলি। তখনই আমাদের আধ্যাত্মিক ও মানসিক পতন শুরু হয়।
২. সন্তান কি পরিবারের ভিত্তি?
আমরা অনেকেই মনে করি, সন্তান আসার পর দাম্পত্য সম্পর্ক গৌণ হয়ে পড়ে। কিন্তু বাস্তবতা হলো—একটি শক্তিশালী পরিবারের ভিত্তি সন্তান নয়, বরং স্বামী-স্ত্রীর মজবুত দাম্পত্য সম্পর্ক। যখন একজন মা তার স্বামী বা নিজের ব্যক্তিগত জীবনকে উপেক্ষা করে, কেবল সন্তানকে ঘিরেই তার পৃথিবী সাজান, তখন পরিবারের কাঠামোটি ভারসাম্যহীন হয়ে পড়ে। স্বামী-স্ত্রী তখন কেবল ‘বাবা-মা’ হিসেবেই পরিচিত হন। তাদের মধ্যকার বন্ধুত্বপূর্ণ ও প্রেমময় সম্পর্কটি হারিয়ে যায়।
যেভাবে পুরুষ সংসারে শান্তি আনতে পারে

৩. ‘নার্সিসিজম’ বা আত্মকেন্দ্রিকতার জন্ম
সন্তানের প্রতি অতিরিক্ত মনোযোগ সন্তান কে বিপদে ফেলে। সন্তানেরা ভাবে মা বাবা যেমন তাদের যত্ন করে, তাদের কেন্দ্র করে আবর্তিত হয় পরিবার। তেমনি পৃথিবী তাদের কেন্দ্র করেই ঘুরবে। এর ফলে:
-
তারা স্বাবলম্বী হতে শেখে না।
-
তাদের মধ্যে দায়িত্ববোধ তৈরি হয় না।
-
ভবিষ্যতে তারা যখন বিয়ে করে, তখন তাদের জীবনসঙ্গীর কাছ থেকেও একইরকম অতি-মনোযোগ আশা করে। যা দাম্পত্য কলহের অন্যতম কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
৪. মা ও ছেলের অস্বাস্থ্যকর সম্পর্ক এবং পরবর্তী জীবন
বইটিতে একটি চমৎকার পয়েন্ট উল্লেখ করা হয়েছে। যখন একজন মা তার ছেলেকে জীবনের একমাত্র অবলম্বন বানিয়ে ফেলেন, তখন সেই ছেলে বড় হয়ে বিয়ে করলে মা প্রায়ই তার পুত্রবধূকে একজন ‘প্রতিপক্ষ’ বা ‘হুমকি’ হিসেবে দেখতে শুরু করেন। ক্ষমতার এই লড়াই এবং সম্পর্কের এই টানাপোড়েনের মূলে রয়েছে সেই দশকের পর দশক ধরে চলে আসা ‘অসুস্থ নির্ভরশীলতা’।
উপসংহার: মুক্তি কোথায়?
আমাদের মনে রাখা উচিত, আমাদের হৃদয়ের কেন্দ্রে বা ‘তাওয়াফের’ জায়গায় একমাত্র আল্লাহ তায়ালা ছাড়া আর কেউ থাকার যোগ্য নয়। আমরা যদি সন্তানকে স্রষ্টার জায়গায় বসিয়ে দিই, তবে তা কেবল আমাদেরই নয়, আমাদের সন্তানদেরও মানসিক বিকাশে বাধা দেয়।
স্বামী স্ত্রীর জীবনে সুখ আনতে পারে এই ভিডিওটি

একটি সুখী পরিবারের জন্য:
-
দাম্পত্য সম্পর্ককে অগ্রাধিকার দিন।
-
সন্তানকে নিজের জীবনের একমাত্র লক্ষ্য না বানিয়ে তাকে একজন স্বাধীন ও দায়িত্বশীল মানুষ হিসেবে গড়ে তুলুন।
-
ভালোবাসার ক্ষেত্রে ভারসাম্য বজায় রাখুন। এতে আপনার এবং সন্তানের উভয়ের জীবনের মঙ্গল।
মূল ভাবনা: “পারিবারিক কাঠামো তখনই শক্তিশালী হয়, যখন তার ভিত্তি হয়ে ওঠে একটি শক্তিশালী দাম্পত্য সম্পর্ক—সন্তানসন্ততি নয়।”
লেখক – সেলিম হোসেন – তাং – ২৭/০২/২০২৬ ইং – প্রতীকী ছবি গুলো এআই জেনারেটেড

