ভুল বিচারে ফাঁসি: একটি মর্মান্তিক সত্য ঘটনা ও নিরপরাধ কুদ্দুসের শেষ চিঠি
আদালতে বিচারকের উদ্দেশ্যে জুতো ছুড়ে মারার মতো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ইদানীং মাঝেমধ্যেই সংবাদে দেখা যায়। বিচার ব্যবস্থার ওপর মানুষের ক্ষোভ বা হতাশা থেকে এমনটা ঘটে। তবে আজ আমি আপনাদের এমন এক ঐতিহাসিক ও হৃদয়বিদারক ভুল বিচারের কাহিনী শোনাব, যা পড়লে আপনার বুক ফেটে আর্তনাদ আসবে। ঘটনাটি ১৯৬৪ সালের বরিশাল জেলা কারাগারের।
আরও পড়ুন – সাপের কামড় কেন ওয়ার্ল্ড নিউজ।

কন্ডেম সেলের সেই বিষণ্ণ বিকেল
বিকেলের সোনালি রোদ যখন জেলখানার কন্ডেম সেলের দেয়ালে লালচে আভা ছড়াচ্ছিল, তখন সেখানে মৃত্যুর প্রহর গুনছিলেন কুদ্দুস নামের এক যুবক। নবীন ডেপুটি জেলার আমিনুর রহমান সেলে গিয়ে ঘোষণা করলেন, “আজ রাতেই আপনার ফাঁসি হবে।”
সাধারণত ফাঁসির খবর শুনলে আসামিরা কান্নাকাটি বা চিৎকার করেন, কিন্তু কুদ্দুস ছিলেন নির্বিকার। আমিনুর সাহেব অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, “আপনার কি কিছু বলার আছে?” কুদ্দুস শান্ত গলায় উত্তর দিলেন, “আমি শুধু ভাবছি, বাবাকে হত্যা না করেও আমি খুনের আসামি। আমার ছোট ছেলেটার মুখটা খুব মনে পড়ছে।”
জেনে নিন – অবহেলায় রোগির মৃত্যু হলে কি করবেন। আইনত উপায় কি ?

সত্য যখন চাপা পড়ে যায় ষড়যন্ত্রের জালে
কুদ্দুসের অপরাধ ছিল না কোনো। তার বর্ণনায় উঠে এলো এক ভয়ংকর পারিবারিক ষড়যন্ত্রের চিত্র। ছোটবেলায় মা মারা যাওয়ার পর তার বাবা দ্বিতীয় বিয়ে করেছিলেন। সেই সৎ মা এবং তার বড় জামাতা মিলে বাবার সম্পত্তি দখলের জন্য কুদ্দুসের বাবাকে নৃশংসভাবে জবাই করে হত্যা করে। আর ঠান্ডা মাথায় সেই দোষ চাপিয়ে দেওয়া হয় নির্দোষ কুদ্দুসের ওপর। এমনকি আদালতে তার সৎ মা নিজের সৎ ছেলের বিরুদ্ধে মিথ্যা সাক্ষ্য দিয়েছিলেন।
“মা আর তার জামাই মিলে বাবাকে মারল, আর আমার কপালে জুটল ফাঁসির দড়ি।” — কুদ্দুস
সন্তান কেন আপনার কথা শুনেনা। আজ থেকে সন্তান আপনার কথা শুনবে, কেন শুনবে জেনে নিন।

হাশরের ময়দানে বিচারের দাবি: কুদ্দুসের শেষ চিঠি
ফাঁসির আগে কুদ্দুস তার সৎ মায়ের উদ্দেশ্যে একটি চিঠি লিখেছিলেন। চিঠির প্রতিটি শব্দে মিশে ছিল কান্না আর আক্ষেপ। তিনি লিখেছিলেন:
“মা, তুমি আর তোমার জামাই মিলে আমারে হত্যা করলা। আমি তো চলে যাচ্ছি, কিন্তু তোমার সাথে দেখা হবে ওপারে—রোজ হাশরের মাঠে। সেখানে তোমার সাথে চূড়ান্ত হিসাব হবে। আমার ছেলেটাকে মানুষ করো। মনে রেখো, আমি যখন আজ একা কবরে যাচ্ছি, কাল তোমাকেও একা যেতে হবে। সেদিন তোমার এই মেয়ে বা জামাই কাউকেই পাশে পাবে না।”
চিঠিটি লেখার সময় কুদ্দুসের চোখের পানিতে কাগজের লেখাগুলো লেপটে যাচ্ছিল। ডেপুটি জেলার আমিনুর রহমান নিজের পকেটের পয়সা খরচ করে সেই চিঠিটি কুদ্দুসের মায়ের ঠিকানায় রেজিস্ট্রি করে পাঠিয়েছিলেন।
চমকে উঠল বিশ্ব, সন্তানের হত্যাকারীর সাথে কি অদ্ভুত আচরন করলেন মা।

ফাঁসির মঞ্চ ও চূড়ান্ত পরিণতি
রাত দেড়টার দিকে কুদ্দুসকে শেষবারের মতো গোসল করানো হয়। তিনি তওবা পড়ে দু’রাকাত নামাজ আদায় করেন। শেষ ইচ্ছা অনুযায়ী তাকে এক গ্লাস দুধ খেতে দেওয়া হয়। এরপর শান্ত পায়ে তিনি ফাঁসির মঞ্চের দিকে এগিয়ে যান।
ম্যাজিস্ট্রেট ডি.জি সেনগুপ্ত এবং সিভিল সার্জন আব্দুল লতিফের উপস্থিতিতে রাত আড়াইটায় ফাঁসি কার্যকর হয়। একটি ভুল বিচারের যবনিকা ঘটাতে রাষ্ট্র পিছপা হলো না।
পরদিন সকালে যখন জেলগেটে লাশ নিতে আসা হলো, তখন কুদ্দুসের মা আসেননি। এসেছিলেন তার সেই বোন আর দুলাভাই। ডেপুটি জেলার আমিনুর রহমান ঘৃণাভরে তাদের বলেছিলেন, “আপনারাই তো খুনটা করেছেন, আর নিরপরাধ ছেলেটাকে ফাঁসালেন!” তারা থতমত খেয়ে অস্বীকার করলেও তাদের চোখের চাউনি অপরাধবোধে ঢাকা ছিল।
আগেকার দিনে গ্রাম বাংলায় কিভাবে বিয়ে নির্ধারিত, জানুন সেই কাহিনি।

উপসংহার
ভুল বিচার শুধু একটি জীবন কেড়ে নেয় না, বরং একটি সাজানো পরিবারকে ধ্বংস করে দেয়। এই ক্ষতিপূরণের কোনো সুযোগ থাকে না। আমরা দোয়া করি, পৃথিবীর কোনো বিচার ব্যবস্থায় যেন এমন চরম ভুল আর কোনো নিরপরাধ মানুষের সাথে না ঘটে।
পড়ুন: [আগেকার দিনে গ্রাম বাংলায় বিয়ের বিচিত্র সব কাহিনী।]
লেখক: সেলিম হোসেন
তারিখ: ১৮/১২/২০২৩
(ছবিগুলো প্রতীকী)
#বিচারবিভাগ

