মোসাদ: ভয়ঙ্কর সিক্রেট এজেন্ট – রোমহর্ষক ৭টি অপারেশন
ইসরায়েলের গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদ। নাম শুনলেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে অত্যাধুনিক প্রযুক্তি, নিখুঁত পরিকল্পনা আর দুর্ধর্ষ সব অপারেশন। শত্রুর কাছে তারা মূর্তিমান আতঙ্ক, আর গোয়েন্দা বিশ্বে তারা পরিচিত ‘সবচেয়ে স্মার্ট ও ভয়ঙ্কর’ বাহিনী হিসেবে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের হলোকাস্ট পরবর্তী সময়ে গঠিত এই সংস্থাটি বছরের পর বছর ধরে এমন সব অভিযান চালিয়েছে, যা কোনো সিনেমার চিত্রনাট্যকেও হার মানায়।
আজকের ব্লগে আমরা মোসাদের ইতিহাসের সবচেয়ে আলোচিত ও রোমহর্ষক কিছু অপারেশন নিয়ে জানব।

১. অপারেশন অ্যাডলফ আইখম্যান (১৯৬০)
হিটলারের নাৎসি বাহিনীর কর্নেল অ্যাডলফ আইখম্যান ছিলেন কয়েক হাজার ইহুদিকে গ্যাস চেম্বারে পাঠিয়ে হত্যার মূল তদারককারী। যুদ্ধের পর তিনি নাম পাল্টে আর্জেন্টিনায় পালিয়ে যান। মোসাদ এজেন্টরা তাকে খুঁজে বের করে বুয়েনস আয়ারস থেকে অপহরণ করে ইসরায়েলে নিয়ে আসে। সেখানে বিচারের মাধ্যমে তার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়। এটি মোসাদের সক্ষমতা বিশ্ব দরবারে প্রথম জানান দেয়।
পড়ুন – এম পি আনোয়ার কেন নিখোঁজ হলেন

২. খালেদ মেশাল অপারেশন (১৯৯৭)
জর্ডানের আম্মানে হামাস নেতা খালেদ মেশালকে হত্যার এক অদ্ভুত পরিকল্পনা করে মোসাদ। এজেন্টরা পর্যটকের ছদ্মবেশে তার কানে এক বিশেষ ধরনের বিষ ছিটিয়ে দেয়। তবে এই অভিযানে এজেন্টরা ধরা পড়ে যায়। পরবর্তীতে জর্ডানের বাদশাহর চাপে ইসরায়েল বিষের প্রতিষেধক পাঠাতে বাধ্য হয় এবং খালেদ মেশাল জীবন ফিরে পান। এটি ছিল মোসাদের ইতিহাসের অন্যতম এক ব্যর্থ অভিযান।
পড়ুন – হৃদয় বিদারক ঘটনা – ভুল বিচারে ফাঁসি

৩. অপারেশন এন্টেবি (১৯৭৬)
তেল আবিব থেকে প্যারিসগামী একটি বিমান হাইজ্যাক করে উগান্ডার এন্টেবি বিমানবন্দরে নিয়ে যায় একদল সশস্ত্র বিদ্রোহী। জিম্মিদের উদ্ধারে মোসাদ নিখুঁত গোয়েন্দা তথ্য সরবরাহ করে। এরপর ইসরায়েলি কমান্ডোরা ৪০০০ কিলোমিটার দূরে গিয়ে এক অভাবনীয় অভিযান চালায়। এই অভিযানে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর ভাই ইয়োনাতান নেতানিয়াহু নিহত হয়েছিলেন।
বিশ্বের সেরা সেরা গোয়েন্দা সংস্থা গুলো কিভাবে কাজ করে ?

৪. অপারেশন ব্রাদার্স (১৯৮০-এর দশক)
সুদানের লোহিত সাগরের উপকূলে একটি নকল ডাইভিং রিসোর্ট তৈরি করেছিল মোসাদ। দিনের বেলায় এজেন্টরা সেখানে পর্যটন ব্যবসার কাজ করত আর রাতে প্রতিবেশী ইথিওপিয়া থেকে আসা হাজার হাজার ইহুদিকে গোপনে পাচার করত। প্রায় ৫ বছর ধরে এই রিসোর্টের আড়ালে ৭০০০-এর বেশি মানুষকে উদ্ধার করা হয়েছিল।
পড়ুন – কিভাবে মদ খেয়ে মারা গেল সাগরিকা এবং পারুল

৫. মিউনিখ অলিম্পিক প্রতিশোধ: অপারেশন রথ অফ গড
১৯৭২ সালের মিউনিখ অলিম্পিকে ইসরায়েলি অ্যাথলেটদের হত্যার প্রতিশোধ নিতে মোসাদ এক দীর্ঘস্থায়ী অভিযান শুরু করে। তারা ‘ব্ল্যাক সেপ্টেম্বর’ গ্রুপের সাথে জড়িত ব্যক্তিদের একে একে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে খুঁজে বের করে হত্যা করে। এর মধ্যে মাহমুদ হামশারিকে তার অ্যাপার্টমেন্টের ফোনের ভেতরে রাখা বিস্ফোরক দিয়ে হত্যা করা ছিল অন্যতম আলোচিত ঘটনা।
এক সময়ের কেজিবি প্রধান পুতিনের বিচিত্র জীবন কাহিনী।

৬. ইয়াহিয়া আয়াশ অপারেশন (১৯৯৬)
হামাসের প্রধান বোমা প্রস্তুতকারক ইয়াহিয়া আয়াশ ছিলেন ইসরায়েলের ‘মোস্ট ওয়ান্টেড’। তাকে হত্যা করতে মোসাদ একটি মটোরোলা আলফা মোবাইল ফোনে ৫০ গ্রাম বিস্ফোরক লুকিয়ে রাখে। যখন তিনি তার বাবার সাথে ফোনে কথা বলছিলেন, ঠিক তখনই দূর নিয়ন্ত্রিত রিমোটের মাধ্যমে ফোনটি বিস্ফোরিত করা হয়।
প্রেমের বিয়ে তারপরেও কেন স্ত্রী গন হিংস্র হয়ে হত্যা করছেন স্বামীদের ?

৭. ইয়োম কিপ্পুর যুদ্ধ (১৯৭৩)
১৯৭৩ সালে মিশর ও সিরিয়া যখন আকস্মিক হামলা চালায়, তখন যুদ্ধের প্রাথমিক দিনগুলোতে ইসরায়েল বড় ধরনের বিপর্যয়ের মুখে পড়েছিল। মোসাদ ও সামরিক গোয়েন্দা সংস্থাগুলো দ্রুত তথ্য সংগ্রহ করে পাল্টা আক্রমণ সাজাতে সহায়তা করে। এই যুদ্ধে আমেরিকা ও সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ অংশগ্রহণ ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতির বড় পরিবর্তন আনে।
মোসাদ ঃ বিশ্বের সবচেয়ে ভয়ঙ্কর, স্মার্ট গোয়েন্দা সংস্থা !! আপনার কি মনে হয় ?

বর্তমান প্রেক্ষাপট ও মোসাদের ভবিষ্যৎ
মোসাদের এত গর্ব আর অহংকার সত্ত্বেও গত ০৭ অক্টোবর ২০২৩ তারিখে হামাসের নজিরবিহীন আক্রমণ পুরো বিশ্বকে স্তব্ধ করে দিয়েছে। মোসাদের মতো সংস্থার নাকের ডগা দিয়ে এমন আক্রমণ তাদের গোয়েন্দা ব্যর্থতাকেই চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে।
উপসংহার: মোসাদ আজ বিশ্বজুড়ে সমাদৃত তাদের প্রযুক্তি আর দুর্ধর্ষ শক্তির জন্য। কিন্তু গত কয়েক দশকের ইতিহাস আমাদের শিক্ষা দেয় যে, দিনের পর দিন শুধুমাত্র শক্তি দিয়ে কোনো জনগোষ্ঠীকে দমিয়ে রাখা যায় না। শাসন করতে শক্তির চেয়েও বেশি প্রয়োজন ‘ইনসাফ’ বা ন্যায়বিচার। আশা করা যায়, বিশ্বনেতারা ইনসাফ কায়েমের পথে হাঁটবেন এবং ফিলিস্তিনিরা তাদের দীর্ঘদিনের ন্যায্য অধিকার ফিরে পাবে।
লেখক: সেলিম হোসেন
তারিখ: ০৮/১০/২০২৩ ইং
(ছবিগুলো প্রতীকী অর্থে ব্যবহৃত)

