স্ট্রেস কী ও মুক্তির উপায়: স্ট্রেস এর লক্ষন কি
প্রারম্ভিকা: যখন স্ট্রেস সীমা অতিক্রম করে
২৪শে মে, যশোরের মনিহার এলাকার ‘সামস মার্কেট’-এর একটি মর্মান্তিক ঘটনা। মার্কেটের দ্বিতীয় তলায় বাস করা খালেদা সুলতানা খানমের লাশ উদ্ধারের পর জানা যায়, তার পালিত ছেলে সামসই এই হত্যাকাণ্ডের জন্য দায়ী। সামস গত পাঁচ বছর ধরে মাদকাসক্ত ছিল।
মাদকাসক্ত ব্যক্তিরা তীব্র স্ট্রেস, বিষণ্ণতা এবং দুশ্চিন্তায় ভোগেন। এই ঘটনাটি আধুনিক জীবনযাত্রার এক কঠিন সত্য তুলে ধরে—আমরা সবাই কমবেশি স্ট্রেসে থাকি। স্ট্রেস হলো কারণ, আর ডিপ্রেশন বা দুশ্চিন্তা হলো তার প্রভাব। এই চাপ শুধু মনকে নয়, আমাদের শরীরকেও ক্ষতিগ্রস্ত করে।
আসুন, আমরা স্ট্রেস কী, এর লক্ষণগুলো কী এবং কীভাবে এই সমস্যা থেকে মুক্তি পাওয়া যায়, তা নিয়ে আলোচনা করি।
মন ভালো করতে সন্যাস গুরু কি শেখালেন শিস্যকে ?

স্ট্রেস ও স্ট্রেস হরমোন কী?
স্ট্রেস হলো দৈনন্দিন জীবনের চাহিদা এবং আমাদের সেই চাহিদা মেটানোর চেষ্টার মধ্যেকার প্রতিক্রিয়া। এটি সম্পূর্ণ স্বাভাবিক হলেও, যখন এটি দীর্ঘস্থায়ী বা ক্রনিক হয়, তখন এটি আমাদের ধ্বংসাত্মক সিদ্ধান্তের দিকে নিয়ে যেতে পারে, যেমনটি সামসের ক্ষেত্রে ঘটেছে।
পারিবারিক, সামাজিক, চাকরিজনিত কারণ, অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা (নিত্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধি) বা সমাজের সঙ্গে খাপ খাওয়াতে না পারা—এগুলো সবই স্ট্রেসের প্রধান কারণ।
যেসব হরমোন দায়ী
স্ট্রেসের সময় আমাদের শরীরের এন্ডোক্রাইন গ্রন্থি থেকে কিছু হরমোন নিঃসৃত হয়। এদের কাজ হলো শক্তি সচল করা, হৃদস্পন্দন বৃদ্ধি করা এবং শরীরের ‘লড়াই করো বা পালাও’ (Fight or Flight) অবস্থার জন্য প্রস্তুত করা।
সুপরিচিত স্ট্রেস হরমোনগুলো হলো: ১. কর্টিসল (Cortisol): এটি প্রধান মানব স্ট্রেস হরমোন। ২. ক্যাটেকোলামাইন (Catecholamines): যেমন অ্যাড্রেনালিন এবং নোরপাইনফ্রিন। ৩. ভ্যাসোপ্রেসিন ৪. গ্রোথ হরমোন
যে পাঁচটি খাবার কখনো খাবেন না।

অক্সিডেটিভ স্ট্রেস: নীরব ঘাতক
অক্সিডেটিভ স্ট্রেস হলো শরীরে ফ্রি র্যাডিকেলের অতিরিক্ত উৎপাদন। সাধারণত অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট এই ফ্রি র্যাডিকেলগুলোকে অকার্যকর করে দেয়। যখন অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট সঠিকভাবে কাজ করতে পারে না এবং ডিটক্সিফাই করার ক্ষমতা কমে যায়, তখনই এই অবস্থার সৃষ্টি হয়।
অক্সিডেটিভ স্ট্রেসের স্বাস্থ্য ঝুঁকি:
- পারকিনসন রোগ এবং আলঝাইমার রোগ
- জিন মিউটেশন এবং ক্যান্সার
- দীর্ঘস্থায়ী ক্লান্তি সিন্ড্রোম
- হৃদরোগ (হার্ট অ্যাটাক, এথেরোস্ক্লেরোসিস) এবং প্রদাহজনিত রোগ
ঔষধ ছাড়াই আজীবন সুস্থ থাকার উপায় জেনে নিন।

স্ট্রেসের ১১টি শারীরিক ও মানসিক লক্ষণ
অতিরিক্ত মানসিক চাপ শারীরিক ও মানসিকভাবে মারাত্মক সমস্যা তৈরি করতে পারে। স্ট্রেসের লক্ষণগুলো জানা তাই অত্যন্ত জরুরি:
১. ব্রণ বেড়ে যাওয়া: স্ট্রেস হরমোন কর্টিসলের অতিরিক্ত নিঃসরণের কারণে ত্বকে ব্রণ বা ব্রেকআউট বেড়ে যেতে পারে।
২. গোলাপি রঙের গাল: শারীরিক পরিশ্রম ছাড়াই গরম লাগা বা ঘামা এবং গালে গোলাপি আভা দেখা দেওয়া হৃদস্পন্দন এবং চাপ বৃদ্ধির লক্ষণ।
৩. সবসময় ক্লান্তি: কারণ ছাড়াই সারাক্ষণ ক্লান্ত বোধ করা বা অব্যক্ত ঘুমের অনুভূতি অ্যাড্রিনাল ক্লান্তির লক্ষণ হতে পারে।
৪. হঠাৎ চুল পড়া: উচ্চ মানসিক চাপের সময় চুল ঝরে পড়া স্বাভাবিক। একে টেলোজেন এফ্লুভিয়ামও বলা যেতে পারে। স্ট্রেস কমলে আবার নতুন চুল গজাতে পারে।
৫. রক্তে শর্করার তারতম্য: অতিরিক্ত স্ট্রেস রক্তে শর্করার মাত্রায় প্রভাব ফেলে, ফলে অস্থিরতা, দুর্বলতা এবং অতিরিক্ত ক্ষুধা অনুভব হতে পারে। বিশেষত রাতের বেলা বা ভোরে কর্টিসলের মাত্রা বাড়লে এমন হয়।
৬. হাত-পা কাঁপা: অতিরিক্ত স্ট্রেসের কারণে হাত-পা বা আঙুল কাঁপতে পারে। এটি শরীরের জমানো চাপ বা ভয় বেরিয়ে আসার লক্ষণ।
দ্রুত ওজন কমানোর উপায় জেনে নিন।

৭. হঠাৎ অজ্ঞান হওয়া: কোনো কারণ ছাড়াই রক্তচাপ কমে গিয়ে সাময়িক অজ্ঞান হওয়ার মতো ঘটনা (সিনকোপ) ঘটতে পারে।
৮. শরীরে ব্যথা: মাথাব্যথা, ঘাড়, চোয়াল বা পিঠে নতুন করে ব্যথা অনুভব করা ক্রনিক স্ট্রেসের লক্ষণ হতে পারে।
৯. চেহারা মলিন: স্ট্রেস প্রদাহ বাড়ায় এবং ফ্রি র্যাডিকেল তৈরি করে, যার ফলে ত্বক মলিন দেখায় এবং বলিরেখা দেখা দিতে পারে।
১০. ঘন ঘন সর্দি-কাশি: স্ট্রেস রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাকে দুর্বল করে দেয়, ফলে ব্যক্তি ঘন ঘন ঠান্ডা বা ফ্লু-তে আক্রান্ত হন।
১১. দাঁত কামড়ানো: অতিরিক্ত স্ট্রেস চোয়ালের পেশিতে চাপ সৃষ্টি করে, যার ফলে ঘুমের মধ্যে দাঁত কামড়ানোর (Bruxism) অভ্যাস তৈরি হতে পারে এবং চোয়ালে ব্যথা হতে পারে।
মানুষ কখন পুরুষাঙ্গ প্রদর্শন করে, কেন করে ?

স্ট্রেস ম্যানেজমেন্ট ও মুক্তির উপায়
স্ট্রেস ম্যানেজমেন্ট হলো জীবনের প্রতি আপনার মনোভাব (Attitude to Life) পরিবর্তন করা। স্ট্রেস মুক্তির জন্য সবার আগে প্রয়োজন ট্রাবল শুটিং— অর্থাৎ, কী কারণে বা কার কারণে আপনার মানসিক চাপ হচ্ছে, তা শনাক্ত করা।
জীবনধারার পরিবর্তন
বিশেষজ্ঞদের মতে, নিম্নলিখিত অভ্যাসগুলো চাপমুক্ত থাকতে সাহায্য করে:
- ইতিবাচক চিন্তা: স্ট্রেসের মূল কারণ শনাক্ত করে ইতিবাচকভাবে চিন্তা করার অভ্যাস গড়ে তুলুন।
- স্বাস্থ্যকর খাবার: জাঙ্ক ফুড ও চিনি এড়িয়ে চলুন। ভিটামিন বি১২, ফলিক অ্যাসিড, আয়রন সমৃদ্ধ প্রাকৃতিক খাবার গ্রহণ করুন।
- পরিমিত ও গভীর ঘুম: প্রতিদিন ৬-৮ ঘণ্টা নিরবচ্ছিন্ন ঘুম নিশ্চিত করুন।
- সামাজিক মেলামেশা: বন্ধু ও পরিবারের সাথে সময় কাটান, আড্ডা দিন। এটি মানসিক চাপ কমাতে দুর্দান্ত কাজ করে।
- নিয়মিত ধর্মীয় চর্চা/ধ্যান: জামাতের সাথে নামাজ আদায় অথবা মেডিটেশন (ধ্যান) মনকে শান্ত করে এবং মস্তিষ্কের বার্ধক্য প্রক্রিয়াকে ধীর করে।
শরীরে ভিটামিন বি ১২ কতটা গুরুত্বপূর্ণ জানেন ?

স্ট্রেস কমানোর ব্যায়াম
আমেরিকান হার্ট অ্যাসোসিয়েশন (AHA) প্রতি সপ্তাহে কমপক্ষে ১৫০ মিনিট মাঝারি ‘অ্যারোবিক’ ব্যায়ামের পরামর্শ দেয়।
অ্যারোবিক ব্যায়ামের রুটিন:
- সপ্তাহে কমপক্ষে পাঁচ দিন ৩০ মিনিট মাঝারি অ্যারোবিক ব্যায়াম করুন।
- সময় কম থাকলে, পুরো ৩০ মিনিটের সেশনটি সারাদিনে তিনবার ১০-মিনিট করে ভেঙে ভেঙে করতে পারেন।
- পেশি শক্তিশালী করার ব্যায়ামগুলো (ভারোত্তোলন, বাগান করা) সপ্তাহে কমপক্ষে দুটি সেশনে রাখুন।
মাঝারি অ্যারোবিক ব্যায়ামের উদাহরণ:
- দ্রুত হাঁটা বা জগিং
- সাইকেল চালানো
- সাঁতার কাটা
- নাচ বা টেনিস
- ভারোত্তোলন (পেশি শক্তিশালী করতে)
লক্ষ্য হার্ট রেট: স্ট্রেস কমাতে ব্যায়ামের মূল কথা হলো ঘাম ঝরানো এবং হার্টবিট স্বাভাবিকের চেয়ে দ্বিগুণ করা। আপনার সর্বোচ্চ হার্টবিট জানতে ১৮০ সংখ্যা থেকে আপনার বর্তমান বয়স বিয়োগ দিন (যেমন: ১৮০ – ৪০ বছর বয়স = ১৪০)। ব্যায়ামের সময় আপনার হার্টবিট যেন এই লক্ষ্যের কাছাকাছি থাকে।










