সিঙ্গারার ইতিহাস: ইরান থেকে বাংলা, যেভাবে জনপ্রিয় হলো এই মুখরোচক খাবার
আগেকার দিনে গ্রামগঞ্জে সিঙ্গারার খুব একটা চল ছিল না। এটি ছিল মূলত শহরের নাস্তা। বিশেষ করে জজ কোর্ট এলাকার আশেপাশে সিঙ্গারার দোকান ছিল অবধারিত। দূর-দূরান্ত থেকে মামলা লড়তে আসা বাদী-বিবাদী আর বিচারপ্রার্থীরা দলবেঁধে বসে ক্ষুধা মেটাতেন এই মুচমুচে সিঙ্গারায়।
একটি প্রচলিত লোককথা: এক মুরুব্বি এসেছেন ছেলেদের নিয়ে মামলায় হাজিরা দিতে। আদালতের কাজ শেষে সবাই মিলে বসেছেন সিঙ্গারার দোকানে। প্রথমবারের মতো সিঙ্গারা খেয়ে স্বাদে মুগ্ধ হয়ে মুরুব্বি তার ছেলেকে জিজ্ঞেস করলেন, “তমেজ, জিনিসটা তো খুব স্বাদ! কিন্তু এর ভেতরে আলু ঢুকলো কীভাবে?” আজকের দিনে আমাদের কাছেও সিঙ্গারার রহস্য অনেকটা সেই তমেজের বাবার মতোই চমকপ্রদ। চলুন জেনে নিই এর পেছনের ইতিহাস।

সিঙ্গারা যেভাবে এল বাংলায়
ধারণা করা হয়, আজ থেকে প্রায় ৫০০-৬০০ বছর আগে ইরান (তৎকালীন পারস্য) থেকে ভারত উপমহাদেশে সিঙ্গারার প্রচলন ঘটে। ইরানের ব্যবসায়ীরা এই অঞ্চলে ব্যবসার উদ্দেশ্যে আসতেন এবং রাতে ‘সরাইখানায়’ (সেকালের আবাসিক হোটেল) অবস্থান করতেন।
দিনের বেলা কাজের প্রয়োজনে যখন বের হতেন, তখন হালকা খাবার হিসেবে তারা সাথে নিতেন এই সিঙ্গারা। এটি দীর্ঘক্ষণ ভালো থাকতো এবং ক্ষুধা মেটাতে ছিল অতুলনীয়।
আদি সিঙ্গারা বনাম বর্তমান সিঙ্গারা:
-
আকৃতি: আটার আবরণে তৈরি পিরামিড আকৃতির এই খাবার।
-
পুর বা উপাদান: শুরুর দিকে সিঙ্গারার ভেতরে আজকের মতো আলু থাকতো না। তখন এর ভেতরে থাকতো মাংস, পেস্তা এবং আখরোট বাদামের মিশ্রণ।
-
রাজকীয় সমাদর: এটি কেবল সাধারণ মানুষের খাবার ছিল না, রাজ দরবারেও এর কদর ছিল। ঐতিহাসিক ইবনে বতুতা সুলতান মুহাম্মদ বিন তুঘলকের দরবারে সিঙ্গারা খাওয়ার কথা উল্লেখ করেছেন।
পড়ুন – আগেকার দিনে বিয়ের পাত্রের যোগ্যতা মাপা হত কিভাবে।

আলু এলো কবে?
আমাদের প্রিয় আলুর সিঙ্গারা কিন্তু অনেক পরের সংযোজন। পর্তুগিজরা এই উপমহাদেশে আলু নিয়ে আসার পর মাংসের পরিবর্তে আলুর পুর দেওয়া শুরু হয়। বর্তমানে আমরা ভারত ও বাংলাদেশে যে সিঙ্গারা খাই, তার প্রধান অনুষঙ্গই হলো এই আলু। রাস্তার পাশের ছোট দোকান থেকে শুরু করে বড় বেকারি—সবখানেই এটি সমান জনপ্রিয়।
জেনে নিন – ওজন কমানো সহজ – সুস্থ থাকা আরও সহজ।
সিঙ্গারা খেলে কি হয়? (স্বাস্থ্য সচেতনতা)
স্বাদে অতুলনীয় হলেও বর্তমানের সিঙ্গারা শরীরের জন্য খুব একটা উপকারী নয়। এর কারণগুলো হলো:
-
অস্বাস্থ্যকর তেল: অধিকাংশ দোকানে একই তেল বারবার ব্যবহার করে সিঙ্গারা ভাজা হয়, যা শরীরে টক্সিন তৈরি করে।
-
পুষ্টিগুণ: ডুবো তেলে ভাজার কারণে এর ভেতরের উপকরণের পুষ্টিগুণ নষ্ট হয়ে যায়।
-
মেদ বৃদ্ধি: এটি একটি উচ্চ ক্যালরিযুক্ত ফাস্ট ফুড, যা ওজন বাড়াতে সাহায্য করে।
সুস্থ থাকতে আমাদের উচিত হাতের কাছে থাকা প্রাকৃতিকভাবে পাওয়া স্বাস্থ্যকর খাবারগুলো বেছে নেওয়া এবং একটি ‘হেলদি লাইফস্টাইল’ অনুসরণ করা।
শেষ কথা
সিঙ্গারা কেবল একটি স্ন্যাক্স নয়, এটি আমাদের সংস্কৃতির এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। কোর্ট-কাচারির আড্ডা থেকে শুরু করে বিকেলের নাস্তা—সিঙ্গারা সবখানেই আছে। তবে সুস্থ থাকতে পরিমিত খাওয়ার অভ্যাস করা জরুরি।
আপনার প্রিয় সিঙ্গারার দোকান কোনটি? আমাদের কমেন্টে জানান!
লেখক: সেলিম হোসেন
তারিখ: ১০/০২/২০২৪ ইং

