আমার মন খারাপ: ডিপ্রেশন ও হতাশা থেকে মুক্তির বিজ্ঞানসম্মত পথ
সাম্প্রতিক সময়ে শিক্ষার্থীদের মধ্যে আত্মহত্যার প্রবণতা এক ভয়াবহ মহামারির রূপ নিয়েছে। আঁচল ফাউন্ডেশনের ২০২৩ সালের সমীক্ষায় দেখা গেছে, গেল এক বছরে দেশে ৫১৩ জন শিক্ষার্থী আত্মহননের পথ বেছে নিয়েছে। পারিবারিক কলহ, পড়াশোনার চাপ, ব্যর্থতা এবং প্রেমের সম্পর্কের টানাপোড়েন—এই ৪৭ শতাংশ আত্মহত্যার মূল কারণ।
মনের ওপর যখন রাজ্যের অশান্তি ভর করে, তখনই মানুষ চরম পথ বেছে নেয়। কিন্তু এই অন্ধকার থেকে ফেরার পথ আছে। বিজ্ঞান এবং জীবনদর্শন কী বলে? চলুন জেনে নিই।

🧠 অপরাধ বিজ্ঞান ও মানসিক চাপের নেপথ্যে
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধবিজ্ঞান বিভাগের সহকারী অধ্যাপক এ বি এম নাজমুস সাকিব মনে করেন, আমাদের অসুস্থ প্রতিযোগিতার সংস্কৃতি শিক্ষার্থীদের ওপর প্রচণ্ড মানসিক চাপ তৈরি করছে। আমরা ভুলে যাচ্ছি যে, প্রত্যেকের যোগ্যতা ও মেধা আলাদা। সবার লক্ষ্য এক হওয়া সম্ভব নয়—এই সত্যটি গ্রহণ না করতে পারাই মানসিক চাপের প্রধান কারণ।
🧬 মন খারাপের বিজ্ঞান: DOSE ফর্মুলা
বিজ্ঞান বলছে, আমাদের মন ভালো থাকা বা খারাপ হওয়া নির্ভর করে শরীরের চারটি বিশেষ হরমোনের ওপর। একে সংক্ষেপে বলা হয় DOSE। এই হরমোনগুলোর ঘাটতি হলেই আমরা বিষণ্ণ বোধ করি।
১. D – Dopamine (ডোপামিন)
এটি ‘পুরস্কার’ হরমোন। আপনি যখন প্রশংসিত হন বা কোনো লক্ষ্য অর্জন করেন, তখন এটি নিঃসৃত হয়।
- কীভাবে বাড়াবেন? প্রোটিনযুক্ত খাবার খান এবং ছোট ছোট লক্ষ্য পূরণ করুন যা আপনাকে তৃপ্তি দেয়।
২. O – Oxytocin (অক্সিটোসিন)
একে বলা হয় ‘ভালোবাসার হরমোন’। এটি সামাজিক বন্ধন দৃঢ় করে।
- কীভাবে বাড়াবেন? মা-বাবার সাথে কথা বলুন, বন্ধুদের সাথে সময় কাটান। প্রিয়জনদের সঙ্গ শরীরে এই হরমোন বাড়াতে জাদুর মতো কাজ করে।

৩. S – Serotonin (সেরোটোনিন)
এটি মুড নিয়ন্ত্রণকারী হরমোন। এর অভাবে ডিপ্রেশন বাড়ে।
- কীভাবে বাড়াবেন? প্রতিদিন সকাল ৯টা থেকে বিকাল ৩টার মধ্যে অন্তত ৩০-৫০ মিনিট সূর্যের আলোতে থাকুন। সূর্যের আলো সেরোটোনিনের প্রাকৃতিক উৎস।
৪. E – Endorphin (এন্ডোরফিন)
এটি শরীরের প্রাকৃতিক ব্যথানাশক। এটি শারীরিক ও মানসিক যন্ত্রণা কমায়।
- কীভাবে বাড়াবেন? নিয়মিত ব্যায়াম বা দৌড়ানো এন্ডোরফিন নিঃসরণের প্রধান উপায়। এছাড়া হাসি মুখে কথা বলা বা সালাম আদান-প্রদান করলেও এটি নিঃসৃত হয়।
পড়ুন – স্ট্রেস আপনার কি ক্ষতি করে

🏃♂️ দৌড়: মন ভালো করার মহৌষধ
অনেকেই মনে করেন ডিপ্রেশন কাটাতে শুধু ওষুধ লাগে, কিন্তু এন্ডোরফিন নিঃসরণের সবচেয়ে শক্তিশালী উপায় হলো দৌড়ানো।
গুরুর সেই বিশেষ উপদেশ:
একবার এক শিষ্য তার গুরুর কাছে গিয়ে বলল, “আমি আত্মহত্যা করতে চাই।” গুরু শান্তভাবে বললেন, “সামনের মাঠটি সাতবার দৌড়ে আসো, তারপর যা খুশি করো।” শিষ্য সাতবার দৌড়ে আসার পর এতটাই ক্লান্ত হয়ে পড়ল যে সে আত্মহত্যা করার কথা ভুলে গিয়ে গভীর ঘুমে তলিয়ে গেল।
শিক্ষা: শারীরিক পরিশ্রম আপনার মস্তিষ্কের রাসায়নিক গঠন বদলে দেয় এবং জীবনের প্রতি ইতিবাচক মনোভাব ফিরিয়ে আনে।
দৌড়ানোর সঠিক নিয়ম (Aerobic Zone):
হার্ট রেট একটি নির্দিষ্ট মাত্রায় রেখে দৌড়ালে মানসিক চাপ দ্রুত কমে। এর সূত্র হলো:
১৮০ – আপনার বয়স = আপনার সর্বোচ্চ হার্ট রেট। (যেমন: আপনার বয়স ২০ হলে, ১৬০ হার্ট রেটের মধ্যে থেকে দৌড়ান।)
পড়ুন – সরিষার তেলে হার্টের অসুখ !!

💡 মন ভালো রাখতে যা করবেন
- ভোরবেলা দৌড়ান: সকালের নির্মল বাতাস টেনশন ঝেড়ে ফেলতে সাহায্য করে।
- ডিজিটাল ডিটক্স: সোশ্যাল মিডিয়া থেকে মাঝে মাঝে বিরতি নিন।
- মায়ের সাথে কথা বলুন: অক্সিটোসিন লেভেল বাড়াতে মায়ের কণ্ঠের চেয়ে বড় কোনো ওষুধ নেই।
- কৃতজ্ঞতা প্রকাশ: প্রতিদিনের ছোট ছোট ভালো কাজের জন্য “আলহামদুলিল্লাহ” বলুন।
সুস্থ থাকতে যে খাবার গুলো কখনো খাবেন না।

🖋 লিখনী: সেলিম হোসেন
📅 তারিখ: ০৪/০৪/২০২৪ ইং
(ছবিগুলো প্রতীকী)
মনে রাখবেন, জীবন একটি অমূল্য উপহার। সাময়িক ব্যর্থতা বা মন খারাপ আপনার জীবনের চেয়ে বড় নয়। যখনই খারাপ লাগবে, একটু দৌড়ান, সূর্যের আলোতে যান এবং প্রিয়জনদের সাথে কথা বলুন। জয় আপনারই হবে।

