আগেকার দিন গুলো: ফেলে আসা নস্টালজিয়া ও গ্রামীণ গল্পের ঝুলি
লিখেছেন: সেলিম হোসেন তারিখ: ২০ জুলাই, ২০২২
পেছনে ফেলে আসা সেই পুরনো দিন আর চিরচেনা পরিবেশ আমাদের সবসময় টানে। সময় চলে আপন গতিতে, আর সময়ের সাথে বদলে যায় পরিবেশ, সামাজিক যোগাযোগ, মানুষের অভ্যাস ও আচরণ। বর্তমান সময়ে পাত্র হিসেবে সরকারি চাকরিজীবীদের কদর আকাশচুম্বী। কিন্তু আগেকার দিনে বিয়ের মাপকাঠি কি এমন ছিল?
সেই সেকালে বিয়ের ব্যবস্থা কীভাবে হতো, তা জানার আগে চলুন কিছু পুরনো দিনের অম্লান গল্প শুনে নেওয়া যাক।
এক যে ছিল টেপা, তার ছিল এক টেঁপি। দাদীর মুখে এমন গল্প শুনেছেন।

নিশ্চল গ্রাম ও সরল মানুষের জীবন
আজকের দিনে আমাদের চারপাশে রাস্তাঘাট আর ঘরবাড়ির দৃশ্য দ্রুত পরিবর্তন হয়। কিন্তু আগেকার দিনে গ্রাম বাংলা ছিল প্রায় নিশ্চল। মানুষগুলোও এখনকার মতো এতটা ধূর্ত বা ধান্দাবাজ ছিল না। সারাদিন কাজকর্ম, গল্প-গুজব আর খেলাধুলা শেষে সন্ধ্যার পরেই নেমে আসত ঘুমের নীরবতা।
গল্প ১: নতুন জামাই ও ‘জিহ্বা পোড়া’ হাট
এক নতুন জামাই এসেছেন শ্বশুরবাড়িতে। জামাই যেমন চটপটে, তেমনি খেতেও খুব পছন্দ করেন। পাটি বিছিয়ে তাকে আপ্যায়নের আয়োজন চলছে। শালি আর সম্বন্ধীর বউরা মিলে পরিবেশন করছেন। গরম গরম পায়েসের সুগন্ধ জামাইকে প্রায় দিশেহারা করে তুলল।
মুরুব্বি বা পরিবেশের তোয়াক্কা না করে তিনি এক চামচ পায়েস মুখে দিলেন। আর দিলেই তো মহাবিপদ! পায়েস ছিল প্রচণ্ড গরম, মুহূর্তেই জিহ্বা পুড়ে গেল। লজ্জা আড়াল করতে জামাই হা করে ঘরের চালের দিকে তাকিয়ে রইলেন।
ভাবী জিজ্ঞেস করলেন, “কী হলো ঠাকুরপো? ওদিকে তাকিয়ে কী দেখছেন?”
জিহ্বার যন্ত্রণা সামলে জামাই বললেন, “ভাবীজান, আপনাদের ঘরের চালের কড়ি কাঠগুলো খুবই সুন্দর। আমি তো অবাক হয়ে ওটাই দেখছিলাম!”
রসিক ছোট ভাবী আঁচলে মুখ ঢেকে হেসেই কুটিপাটি। তিনি বললেন, “কাঠগুলো আপনার ছোট সম্বন্ধী ‘জিহ্বা পোড়া হাট’ থেকে কিনেছে। হাটটি আমাদের বাড়ির খুব কাছেই, কাল আপনাকে ওখানে ঘুরিয়ে আনতে বলব!”
মাদকের বিষাক্ত ছোবল এখন ছড়িয়ে পড়েছে গ্রামেও।

গল্প ২: শিক্ষিত পাত্র ও ঘটকের ‘নলেজ’
খালেক কলকাতা থেকে পড়াশোনা শেষ করে গ্রামে ফিরেছে। তার বাবা গ্রামের প্রভাবশালী মাতব্বর। ছেলের বিয়ের জন্য তিনি ঘটককে তলব করলেন এবং বললেন, “আমার ছেলের মতো শিক্ষিত ছেলে দশ গ্রামে একটাও নেই। তার জন্য সুন্দরী এবং শিক্ষিতা পাত্রী চাই।”
ঘটক অনেক খোঁজাখুঁজির পর সাত গ্রাম পরে এক স্কুল মাস্টারের মেয়ের সন্ধান পেলেন। ঘটক মাস্টারের সামনে বসে পাত্রের গুণের বর্ণনা দিচ্ছিলেন—”মাস্টার সাহেব, ছেলে কলকাতা ফেরত, যেমন জ্ঞান-গরিমা তেমন জমিজমা। আপনার মেয়ে একদম রানীর হালে থাকবে।”
মাস্টার সাহেব ধীরস্থিরভাবে শুনে জিজ্ঞেস করলেন, “সবই তো বুঝলাম, তা ছেলের ‘নলেজ’ (Knowledge) কেমন?”
অশিক্ষিত ঘটক ‘নলেজ’ শব্দের মানে জানতেন না। তিনি কয়েক সেকেন্ড ভেবে আমতা আমতা করে বললেন, “নলেজ ভালোই ছিল, তবে ইদানিং আর দেখি নাই। ছোটবেলায় যখন গামছা পরে পুকুরে গোসল করত, তখন গামছার ফাঁক দিয়ে দেখেছি—নলেজটা বেশ বড়ই আছে!”
জেনে নিন – কিভাবে সহজে ওজন কমাবেন এবং সুস্থ থাকবেন।

সেকালের বিয়ে ও সামাজিক প্রেক্ষাপট
আগেকার দিনে পাত্র নির্বাচনের মাপকাঠি আজকের মতো ছিল না। মুরুব্বীদের কাছে শুনেছি, অতীতে কন্যার পিতারা পাত্রের বাড়িতে গিয়ে দেখতেন কয়টি খড়ের গাদা আছে আর কয়টি টিনের ঘর আছে। বাড়িতে টিনের ঘর আর ধানের বড় খড়ের গাদা দেখেই আঁচ করা যেত পাত্রের আর্থিক অবস্থা। এরপর দেখা হতো বংশীয় মর্যাদা। এভাবে উভয় পক্ষ একমত হলেই সানাই বাজত।
সম্প্রতি পাবনা জেলার বেড়া উপজেলার ঢালারচর গ্রামে গিয়ে অনেকদিন পর সেই চিরচেনা খড়ের গাদা আর টিনের ঘরের দেখা পেলাম। আধুনিকতার ছোঁয়ায় এগুলো এখন বিলুপ্তপ্রায়।
কুয়াশায় ঢাকা গ্রাম বাংলার দৃশ্য ভিডিওতে।
ছবি সৌজন্যে: পেক্সেলস (Pexels)
আপনার মতামত জানান: আপনার ছোটবেলায় দেখা গ্রামীণ কোনো মজার স্মৃতি আছে কি? কমেন্টে আমাদের সাথে শেয়ার করতে পারেন!

