কারবালার পর: আহলে বাইয়াতের ওপর যে ভয়ঙ্কর অধ্যায় নেমে এসেছিল
১০ই মহররম, ৬১ হিজরি। কারবালা প্রান্তর নিস্তব্ধ। আহলে বাইয়াতের রক্তে ভিজে আছে মরুভূমির তপ্ত বালু। ইমাম হোসাইন (রাঃ)-এর শাহাদাতের পর শিশু জয়নুল আবেদিন ছিলেন পুরুষদের মধ্যে একমাত্র জীবিত উত্তরসূরি। কারবালার সেই শোক আজও মুসলিম উম্মাহ বয়ে বেড়াচ্ছে, কিন্তু কারবালার প্রান্তরে তলোয়ার থেমে গেলেও আহলে বাইয়াতের ওপর জুলুমের ধারা থেমে থাকেনি। কারবালার পরবর্তী ইতিহাসের সেই অজানা ও বিষাদময় কাহিনী নিয়ে এই আয়োজন।
মেজাজ খিটখিটে, আচরন আক্রমনাত্মক। সহিংস মুভি দেখার অভ্যাস আছে ?

১. ইমাম জয়নুল আবেদিন ও খলিফা হিসামের ঈর্ষা
কারবালার বিভীষিকা থেকে বেঁচে ফেরা ইমাম জয়নুল আবেদিন মদিনায় অত্যন্ত শান্ত ও আধ্যাত্মিক জীবন যাপন করতেন। তিনি নিজেকে রাজনীতি থেকে সম্পূর্ণ দূরে রাখলেও মানুষের হৃদয়ে তার প্রভাব ছিল আকাশচুম্বী।
একবার উমাইয়া খলিফা হিসাম ইবনে আব্দুল মালিক হজ করতে যান। কালো পাথরে (হাজরে আসওয়াদ) চুমু খাওয়ার জন্য বিশাল ক্ষমতার অধিকারী খলিফা ভিড়ের কারণে এগোতে পারছিলেন না। কিন্তু জয়নুল আবেদিন যখন এলেন, জনতা পরম শ্রদ্ধায় পথ ছেড়ে দিল। এই দৃশ্য দেখে খলিফা ঈর্ষায় ফেটে পড়েন। ক্ষমতার মসনদ হারানোর ভয়ে জয়নুল আবেদিনকে রাজনীতির সাথে জড়িত না থাকা সত্ত্বেও বিষ প্রয়োগে হত্যা করা হয়।
পড়ুন – মায়ের ভালোবাসা, মায়ের উদারতা।
২. ইমাম মুহাম্মদ আল বাকির: জ্ঞানের সাগরে ষড়যন্ত্রের বিষ
পিতার শাহাদাতের পর ইমাম হন মুহাম্মদ আল বাকির। তিনি ছিলেন অগাধ জ্ঞানের অধিকারী। জনতা স্রোতের মতো তার কাছে আসতে থাকে। খলিফা হিসাম এবারও শঙ্কিত হয়ে পড়েন। তিনি তার ভাগ্নে ইব্রাহিম ইবনে ওয়ালিদকে মদিনায় পাঠান।
ইব্রাহিম অত্যন্ত সুকৌশলে একটি বিষ মিশ্রিত ঘোড়ার জিন উপহার দেন ইমামকে। ঘোড়ায় চড়ামাত্র সেই বিষ ইমামের শরীরে ছড়িয়ে পড়ে এবং তিনি অত্যন্ত যন্ত্রণাদায়কভাবে শাহাদাত বরণ করেন।
৩. ইমাম জাফর সাদিক: উমাইয়া ও আব্বাসীয়দের কোপানল
ইমাম মুহাম্মদ আল বাকিরের পর ইমাম হন জাফর ইবনে মুহাম্মদ আল সাদিক। তার সময়টি ছিল রাজনৈতিকভাবে চরম অস্থির। একদিকে উমাইয়াদের পতন, অন্যদিকে আব্বাসীয়দের উত্থান। জাফর সাদিক ছিলেন একজন মহান শিক্ষক; ইমাম আবু হানিফা এবং ইমাম মালিকের মতো মনীষীরাও তার ছাত্র ছিলেন।
উমাইয়া খলিফাদের পর আব্বাসীয় খলিফা আল মনসুর ইমামের ক্রমবর্ধমান জনপ্রিয়তায় আতঙ্কিত হয়ে পড়েন। তিনি ইমামকে মদিনা থেকে বাগদাদে স্থানান্তরিত হতে বাধ্য করেন এবং নজরবন্দি করতে চান। শেষ পর্যন্ত হিজরি ১৪৮ সালে জননন্দিত এই ইমামকেও বিষ প্রয়োগে হত্যা করা হয়।
দেখুন – কারবালার ইতিহাস- আশুরা কি ? ডঃ খোন্দকার আব্দুল্লাহ জাহাঙ্গীর।

৪. ইমাম মুসা আল কাজিম: কারাগার ও শাহাদাত
ইমাম জাফর সাদিকের পর তার কনিষ্ঠ পুত্র মুসা আল কাজিম ইমাম নিযুক্ত হন। তার সময়ে খলিফা ছিলেন হারুন আল রশিদ। যদিও হারুন আল রশিদ শুরুতে ইমামের পাণ্ডিত্য দেখে মুগ্ধ হয়েছিলেন, কিন্তু পরে কুচক্রীদের প্ররোচনায় তিনিও সন্দেহপ্রবণ হয়ে ওঠেন।
খলিফা মনে করতেন ইমাম গোপনে বিদ্রোহের প্রস্তুতি নিচ্ছেন। ইমামকে মদিনা থেকে গ্রেফতার করে বাগদাদে নিয়ে আসা হয়। দীর্ঘদিন কারাবন্দি রাখার পর ৭৯৯ খ্রিস্টাব্দের ৪ঠা সেপ্টেম্বর ৫৩ বছর বয়সে এই মহান ব্যক্তিত্বকেও বিষ প্রয়োগে হত্যা করা হয়।
ভিডিও দেখুন – কারবালার বর্তমান পরিবেশ।

উপসংহার
কারবালা কেবল একটি দিনের ঘটনা নয়; এটি ছিল ত্যাগের এক দীর্ঘ পরিক্রমা। কারবালার পরেও আহলে বাইয়াতের প্রতিটি ইমামকে যে নির্মম পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে, তা আমাদের অনেকেরই অজানা। ক্ষমতার মোহে অন্ধ শাসকরা বারবার নবীবংশের প্রদীপ নিভিয়ে দিতে চেয়েছেন, কিন্তু মানুষের হৃদয়ে তাঁদের মর্যাদা আজও অম্লান।
পড়ুন – কারবালার আরও করুন ইতিহাসের কাহিনী এবং আশুরার তাৎপর্য।

লেখক: সেলিম হোসেন
তারিখ: ১৭-০৭-২০২৪ ইং
(তথ্যসূত্র: ঐতিহাসিক বিভিন্ন গ্রন্থ ও সমসাময়িক ইসলামিক স্কলারদের লেকচার)


