বিজয়ের মাস ডিসেম্বর: ইতিহাসের কিছু কালো অধ্যায় ও বিজয় গাঁথা
বিজয়ের মাস ডিসেম্বর আমাদের জাতীয় জীবনে এক গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায়। কিন্তু এই বিজয়ের পেছনের ইতিহাস যেমন ত্যাগের, তেমনি তৎকালীন শাসকগোষ্ঠীর চারিত্রিক স্খলন আর অযোগ্যতার গল্পে ভরা। দেশভাগের পর থেকেই পাকিস্তানি শাসকরা আমাদের ওপর বিমাতাসুলভ আচরণ শুরু করে, যা আজকের দিনের কিছু বৈষম্যমূলক আচরণের সঙ্গেই তুলনীয়।
পাকিস্তানের ক্ষমতা কাঠামো ও নৈতিক অবক্ষয়
পাকিস্তানের রাষ্ট্র ক্ষমতায় একে একে এমন সব ব্যক্তিরা আসতে থাকেন যারা ব্যক্তিগত জীবনে ছিলেন চরম বিশৃঙ্খল। তাদেরই একজন প্রেসিডেন্ট ইস্কান্দার মির্জা। সে সময় প্রধানমন্ত্রী ছিলেন হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী। তাদের মধ্যে সম্পর্ক ছিল অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ, যা অনেক সময় পারিবারিক শালীনতার সীমাও ছাড়িয়ে যেত।
একটি ঘটনার কথা উল্লেখ করা যায়— সোহরাওয়ার্দীর বাসায় এক পার্টিতে মির্জা ইস্কান্দারের স্ত্রী নাহিদ অতিরিক্ত মদ্যপানে অচেতন হয়ে পড়েন। অথচ স্বামী হিসেবে মির্জা ইস্কান্দার তাকে ওভাবেই ফেলে রেখে চলে যান। পরবর্তীতে সোহরাওয়ার্দী তাকে তার বাসভবনে পৌঁছে দিয়ে আসেন। এই ঘটনাগুলো তৎকালীন শাসকগোষ্ঠীর নৈতিক দেউলিয়াত্বকেই ফুটিয়ে তোলে।
দ্রষ্টব্য: ১৯৫৮ সালের ৭ অক্টোবর ইস্কান্দার মির্জা সামরিক আইন জারি করেন এবং আইয়ুব খান প্রধান প্রশাসক নিযুক্ত হন। মাত্র ২০ দিন পরেই এক ক্যু-এর মাধ্যমে আইয়ুব খান ক্ষমতা দখল করেন।

ইয়াহিয়া খানের অযোগ্যতা ও ১৯৭১-এর পরাজয়
আইয়ুব খানের পর ক্ষমতায় আসেন ইয়াহিয়া খান। তার চারিত্রিক স্খলন ছিল ইতিহাসের পাতায় কুখ্যাত। ১৯৭১ সালের ৩ ডিসেম্বর যখন ভারতীয় বাহিনী মুক্তিযোদ্ধাদের সাথে একীভূত হয়ে হানাদার বাহিনীর ওপর চূড়ান্ত আক্রমণ শুরু করে, সেই চরম মুহূর্তেও ইয়াহিয়া ছিলেন চরম উদাসীন।
শোনা যায়, যুদ্ধের এই ভয়াবহ খবর নিয়ে যখন এক সেনা অফিসার ইয়াহিয়ার দপ্তরে যান, তখন তাকে দুই ঘণ্টা বাইরে অপেক্ষা করতে হয়। কারণ প্রেসিডেন্ট তখন আমোদ-প্রমোদে মত্ত ছিলেন। এই ধরনের দায়িত্বজ্ঞানহীন নেতৃত্ব আর নয় মাসের চরম নৃশংসতার পর অবশেষে এই ডিসেম্বরেই পাকিস্তানি বাহিনী পরাজয় বরণ করতে বাধ্য হয়।
পড়ুন – আমেরিকায় প্রেসিডেন্ট নির্বাচন, ট্রাম্প বা বাইডেন কি রেকর্ড ভাঙবেন?

একটি ঐতিহাসিক বিদ্রূপ: দোজখে ইয়াহিয়া ও জিয়াউল হক
১৯৭৮ সালে পাকিস্তানে ক্ষমতা দখল করেন জেনারেল জিয়াউল হক। তার স্বৈরশাসন নিয়ে সে সময় প্রচুর রাজনৈতিক কৌতুক বা জোকস প্রচলিত ছিল। এমনই একটি প্রচলিত গল্প (Satire) পাঠকদের জন্য তুলে ধরা হলো:
কথিত আছে, মৃত্যুর পর জিয়াউল হক দোজখের বিভিন্ন স্তর পরিদর্শন করছিলেন।
-
প্রথম দোজখে: তিনি দেখলেন গোলাম মোহাম্মদ শাস্তির আগুনে পুড়ছেন।
-
দ্বিতীয় দোজখে: আইয়ুব খানকে বীভৎসভাবে শাস্তি দেওয়া হচ্ছে।
-
তৃতীয় দোজখে: জুলফিকার আলী ভুট্টোকে আগুনের উত্তাপে দগ্ধ করা হচ্ছে।
অবশেষে চতুর্থ দোজখে গিয়ে জিয়াউল হক অবাক হলেন। দেখলেন শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত ঘরে ইয়াহিয়া খান সুন্দরী এক নারীর সাথে আয়েশ করছেন। জিয়াউল হক ভাবলেন এটাই বোধহয় সবচেয়ে আরামদায়ক জায়গা এবং তিনি সেখানেই থাকতে চাইলেন। কিন্তু দোজখের পরিচালক তাকে ভুল সংশোধন করে দিয়ে বললেন, “এখানে ইয়াহিয়া শাস্তি পাচ্ছেন না, শাস্তি পাচ্ছেন ওই নারী— কারণ ইয়াহিয়াকে সহ্য করাই তার জন্য সবচাইতে বড় শাস্তি!”

উপসংহার
ডিসেম্বর শুধু ক্যালেন্ডারের একটি মাস নয়, এটি আমাদের আত্মপরিচয় খুঁজে পাওয়ার মাস। যে শাসকরা আমোদ-প্রমোদে মত্ত থেকে একটি জাতিকে দাবিয়ে রাখতে চেয়েছিল, ইতিহাস তাদের আস্তাকুঁড়ে নিক্ষেপ করেছে।
পড়ুন: [কেন ভরা মজলিশে পুরুষাঙ্গ প্রদর্শন করলেন মোগল সম্রাট মোহাম্মদ শাহ্?]
লেখক: সেলিম হোসেন
তারিখ: ৩১/১২/২০২৩ ইং

