ডায়াবেটিস কেন হয় কিশোর-কিশোরীদের? জেনে নিন প্রতিকারের উপায়
সাম্প্রতিক খবরের কাগজে চোখ রাখলে বুক কেঁপে ওঠে—১৩ বছরের এক কিশোর ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হয়ে দৃষ্টিশক্তি হারিয়েছে, ২০ বছরের এক তরুণ হাসপাতালের বিছানায় লড়ছে এই মরণব্যাধির সাথে।
স্বাস্থ্য বিভাগের জরিপ অনুযায়ী, বাংলাদেশে ১৫ থেকে ৩৫ বছর বয়সীদের মধ্যে ৭ শতাংশ সরাসরি ডায়াবেটিসে আক্রান্ত এবং ৬১ শতাংশের শরীরে ডায়াবেটিস সুপ্ত অবস্থায় (Pre-diabetes) আছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ২০২৩ সালের তথ্য বলছে, ডায়াবেটিস আক্রান্তের সংখ্যায় বাংলাদেশ বিশ্বে অষ্টম।
ডায়াবেটিস কী ও কত প্রকার?
ডায়াবেটিস মূলত দুই প্রকার:
-
টাইপ-১: শরীরে ইনসুলিন তৈরি হয় না। রোগীরা সাধারণত বেশ হালকা-পাতলা গড়নের হন।
-
টাইপ-২: শরীরে পর্যাপ্ত ইনসুলিন তৈরি হলেও কোষের অতিরিক্ত চর্বির কারণে তা কাজ করতে পারে না। ডায়াবেটিস রোগীদের প্রায় ৯০ শতাংশই এই টাইপ-২ এর শিকার। এরা সাধারণত স্থূল বা ওজনাধিক্য হয়ে থাকেন।

অল্প বয়সে ডায়াবেটিস হওয়ার প্রধান ৪টি কারণ
১. অস্বাস্থ্যকর পারিবারিক লাইফস্টাইল (জিনগত ভীতি নয়)
অনেকে মনে করেন বাবা-মায়ের ডায়াবেটিস থাকলে সন্তানের হবেই। আধুনিক গবেষণা বলছে, এটি যতটা না জিনগত, তার চেয়ে বেশি জীবনযাত্রার প্রভাব। বাবা-মা যে অস্বাস্থ্যকর খাবার ও অলস জীবনযাপনে অভ্যস্ত, সন্তানরাও সেই একই পরিবেশে বড় হচ্ছে। ফলে তারাও দ্রুত আক্রান্ত হচ্ছে।
২. মানসিক চাপ ও সামাজিক মাধ্যমের প্রভাব
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অন্যের সাফল্যের চাকচিক্য দেখে তরুণ প্রজন্ম অবচেতন মনেই দুশ্চিন্তায় ভোগে। এই অতিরিক্ত দুশ্চিন্তা শরীরে এমন হরমোন নিঃসরণ করে, যা ইনসুলিনের কার্যকারিতা কমিয়ে দেয়। ফলে অগ্ন্যাশয় সঠিকভাবে কাজ করতে পারে না এবং রক্তে শর্করার মাত্রা বেড়ে যায়।

৩. হাই-ক্যালোরি ও জাঙ্ক ফুড
ফুড ইন্ডাস্ট্রির জয়জয়কার আমাদের সন্তানদের বিপদে ফেলছে। বার্গার, পিৎজা, কেক, চিপস এবং চিনিযুক্ত পানীয় শিশুদের রক্তে সুগারের মাত্রা অস্বাভাবিক বাড়িয়ে দিচ্ছে। অনেক বাবা-মা আদর করে এসব খাবার কিনে দিয়ে অজান্তেই সন্তানের ভবিষ্যৎ নষ্ট করছেন।
৪. শারীরিক পরিশ্রমের অভাব ও স্থূলতা
খেলার মাঠের অভাব এবং স্মার্টফোনের আসক্তিতে কিশোর-কিশোরীরা এখন ঘরবন্দী। শারীরিক পরিশ্রম না থাকায় এবং প্রয়োজনের চেয়ে বেশি ক্যালোরি গ্রহণ করায় শরীর থলথলে হয়ে যাচ্ছে। এই অতিরিক্ত ওজনই তাদের ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্সের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
পড়ুন – দ্রুত ওজন কমাবেন কিভাবে ?

মুক্তির উপায়: সুস্থ প্রজন্মের জন্য আমাদের করণীয়
ডায়াবেটিস মূলত ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্সের সমস্যা। লাইফস্টাইল পরিবর্তনের মাধ্যমে ঔষধ ছাড়াই এই রোগ নিয়ন্ত্রণ বা রিভার্স করা সম্ভব।
-
খাদ্যাভ্যাসে পরিবর্তন: শিশুদের প্রাকৃতিক ও স্বাস্থ্যকর খাবারে অভ্যস্ত করুন। সালাদ, চিয়া সিড পুডিং, সতে সবজি বা ফুলকপির বিরিয়ানির মতো পুষ্টিকর ও সুস্বাদু রেসিপি ঘরেই তৈরি করুন।
-
স্মার্টফোনের বিকল্প: সন্তানদের স্মার্টফোন থেকে দূরে রেখে খেলাধুলা বা কায়িক পরিশ্রমে উৎসাহিত করুন।
-
মানসিক প্রশান্তি: তাদের বোঝান যে জীবন কোনো অন্ধ প্রতিযোগিতা নয়। বর্তমান কাজে মন দিলে ভবিষ্যৎ এমনিতেই সুন্দর হবে।
-
একত্রে ব্যায়াম: নিজেরা নিয়মিত ব্যায়াম করুন এবং শিশুদের সাথে নিন। এতে তারা উৎসাহিত হবে।
মনে রাখবেন: আজ যদি আমরা সচেতন না হই, তবে আগামী ৫ থেকে ২০ বছরের মধ্যে আমাদের পরবর্তী প্রজন্মের একটি বড় অংশ ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্সের শিকার হবে। সুস্থ জীবনযাপনই হোক আমাদের প্রধান ঔষধ।
ভিডিও টি দেখুন সব কিছু একেবারেই সহজ মনে হবে।

তথ্যসূত্র: ডাঃ এরিক বার্গ, ডাঃ জাহাঙ্গীর কবির, ডাঃ মজিবুল হক এবং আন্তর্জাতিক মেডিকেল জার্নালসমূহ। লেখক: সেলিম হোসেন (০২/০২/২০২৪)

