আব্রাহাম লিঙ্কন: ব্যর্থতার ছাই থেকে উঠে আসা এক বিশ্বজয়ী নেতার গল্প
আমেরিকার ১৬তম প্রেসিডেন্ট আব্রাহাম লিঙ্কন। যাকে ধরা হয় দেশটির সর্বকালের সেরা রাষ্ট্রনায়ক। দাসপ্রথা বিলোপ করে তিনি শুধু আমেরিকাকেই নয়, বরং পুরো বিশ্বকে এক নতুন মানবিক পথ দেখিয়েছিলেন। কিন্তু এই সাফল্যের পাহাড়সম উচ্চতায় পৌঁছানোর আগে তাকে পাড়ি দিতে হয়েছিল সীমাহীন ব্যর্থতার সমুদ্র।
শৈশব ও জীবনসংগ্রাম: জীর্ণ কুটির থেকে শুরু
১৮০৯ সালে কেন্টাকির এক জীর্ণ কাঠের ঘরে লিঙ্কনের জন্ম। তার শৈশব ছিল চরম অভাবের।
-
মাতৃবিয়োগ: মাত্র ৯ বছর বয়সে তিনি তার মা ন্যান্সিকে হারান।
-
সৎ মায়ের প্রভাব: মা মারা যাওয়ার পর তার জীবনে আশার আলো হয়ে আসেন সৎ মা সারা বুশ জনস্টন। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা না থাকলেও সৎ মায়ের উৎসাহে লিঙ্কন হয়ে ওঠেন স্বশিক্ষিত।
-
জ্ঞানের তৃষ্ণা: বই পড়ার জন্য তিনি মাইলের পর মাইল হেঁটে যেতেন বন্ধুদের বাড়িতে। নৌকা চালানো থেকে শুরু করে মুদি দোকানদারি—জীবিকার তাগিদে করেছেন সব ধরনের পরিশ্রম।
পড়ুন – স্বামী স্ত্রীর একান্ত মিলন হবে আরও মধুর আরও আনন্দের।

ব্যর্থতার সিঁড়ি বেয়ে সাফল্যের শিখরে
লিঙ্কনের রাজনৈতিক ও ব্যক্তিগত জীবন ছিল দীর্ঘস্থায়ী হারের এক তালিকা:
- চাকরি হারানো ও নির্বাচনে হার: ২৩ বছর বয়সে চাকরি হারান এবং প্রথমবার নির্বাচনে হেরে যান।
- ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি: বিয়ের স্বপ্ন দেখেছিলেন যার সাথে, সেই প্রেয়সী রুথলেজ টাইফয়েড জ্বরে মারা যান।
- ধারাবাহিক পরাজয়: ২৯ বছর বয়সে হাউজ অব রিপ্রেজেন্টেটিভ এবং ৩৯ বছর বয়সে জেনারেল ল্যান্ড অফিসের কমিশনার নির্বাচনে পরাজিত হন। ৪৯ বছর বয়সে সিনেটর হওয়ার লড়াইয়েও জোরালো হার জোটে তার কপালে।
পরিশেষে: এত ব্যর্থতার পরও দমে যাননি তিনি। অবশেষে ১৮৬১ সালে ৫২ বছর বয়সে তিনি আমেরিকার প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন।
জেনে নিন – সফল হওয়ার সাতটি উপায়।

রাষ্ট্র পরিচালনায় দৃঢ়তা: নায়াগ্রা জলপ্রপাতের সেই উদাহরণ
প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর যখন সবাই তার সমালোচনা করছিল, তখন তিনি একটি চমৎকার উদাহরণ দিয়েছিলেন:
“একজন লোক যখন তার সব সম্পত্তি বস্তায় ভরে নায়াগ্রা জলপ্রপাতের ওপর টাঙানো দড়ির ওপর দিয়ে পার হয়, তখন কি আপনারা দড়ি ধরে নাড়াচাড়া করবেন? করবেন না। তেমনি আমার সরকারও একটি ভারি বোঝা বহন করে চলেছে। আমাদের কাজ করতে দিন, আমরা অবশ্যই নিরাপদে গন্তব্যে পৌঁছাব।”

আব্রাহাম লিঙ্কনের ঐতিহাসিক অবদানসমূহ
তার শাসনকাল ছিল আমেরিকার ইতিহাসের সবচেয়ে সংকটময় সময় (গৃহযুদ্ধ)। কিন্তু তার বলিষ্ঠ নেতৃত্বে যা অর্জিত হয়েছিল তা ইতিহাস বদলে দেয়:
-
দাসপ্রথা বিলোপ: ১৮৬৩ সালের ১ জানুয়ারি তিনি ‘ইমানসিপেশন প্রোক্লেমেশন’ বা দাসমুক্তি ঘোষণা করেন। এর মাধ্যমে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে চিরতরে দাসপ্রথা বিলুপ্ত হয়।
-
জাতির ঐক্য: গৃহযুদ্ধের সময় ‘সিভিল ওয়ার’র কমান্ডার ইন চিফ হিসেবে তিনি দেশকে খণ্ডবিখণ্ড হওয়ার হাত থেকে রক্ষা করেন।
-
আধুনিক অর্থনীতি: আমেরিকার অর্থনীতির আধুনিকীকরণে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।
কোন অফিসে চাকরি করলে ডেটিং যাওয়ার জন্য ছুটি পাওয়া যায়।

করুণ প্রস্থান ও অমর কীর্তি
১৮৬৫ সালে যখন গৃহযুদ্ধে ইউনিয়ন বাহিনী বিজয়ের খুব কাছে, তখন ঘাতকের বুলেটে নিহত হন এই মহান নেতা। ওয়াশিংটন ডিসির ফোর্ডস থিয়েটারে জন উইলকস বুথ তাকে পেছন থেকে গুলি করেন। তিনি চলে গেছেন, কিন্তু রেখে গেছেন সাম্য ও স্বাধীনতার অমূল্য দর্শন।
পড়ুন – পারস্যের বীর নাদির শাহ কিভাবে সফল হলেন।

জীবনবোধ ও আধ্যাত্মিক সান্ত্বনা
আব্রাহাম লিঙ্কনের মতো সফল মানুষের জীবনেও যদি এত বিরহ ও কষ্ট থাকতে পারে, তবে আমাদের হতাশ হওয়া সাজে না। পবিত্র কোরআনেও ধৈর্য ও পরীক্ষার বিষয়ে উল্লেখ করা হয়েছে:
“তোমরা কি একথা ভেবে বসে আছ যে, তোমরা জান্নাতে প্রবেশ করবে অথচ এখনো তোমাদের পূর্ববর্তীদের মত তোমাদের পরীক্ষা করা হয়নি? তারা অভাবগ্রস্ত, রোগাক্রান্ত ও প্রকম্পিত হয়েছিল।” (সূরা বাকারা: ২১৪)
আমাদের চারপাশের প্রতিটি ঘরেই শোক-দুঃখ আছে। কিন্তু বিশ্বাস ও শ্রম থাকলে সেই অন্ধকার কেটে আলো আসবেই—লিঙ্কনের জীবন তারই প্রমাণ।
লেখক: সেলিম হোসেন
তারিখ: ১৫ আগস্ট, ২০২২

