প্রবাসীদের বঞ্চনা প্রবাসীদের কষ্ট। রেমিট্যাঁন্স যোদ্ধা শুধুই গাল ভরা নাম। Bangladeshi expatriate worker feel pain abroad

প্রবাসীদের বঞ্চনা

প্রবাসীদের কষ্টের আখ্যান: রেমিট্যান্স যোদ্ধাদের জীবনের কি কোনো মূল্য নেই?

প্রবাসীদের জন্য কোন দেশ ভালো? সুযোগ-সুবিধা আর জীবনযাত্রার মান বিচারে অনেকেই হয়তো ইতালিকে সেরার তালিকায় রাখবেন। কিন্তু সেই ইতালির বুকেই সম্প্রতি ঘটে গেছে এক করুণ ঘটনা, যা আমাদের হৃদয়কে নাড়া দেয় এবং প্রবাস জীবনের এক অন্ধকার দিক উন্মোচন করে।

রোমের পার্কে এক নিথর দেহ

২৪শে জানুয়ারি, সকাল ৭টা। ইতালির রাজধানী রোম। তুসকোলানা জুলিও আগ্রিকোলা পার্কের পেছনের গির্জার কাছে এক পথচারী যা দেখলেন, তাতে তিনি শিউরে উঠলেন। ভুত দেখার মতো চমকে উঠে দেখলেন—একজন মানুষের নিথর দেহ ঝুলছে। খবর পেয়ে পুলিশ এসে লাশ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য নিয়ে যায়। রিপোর্টে উঠে আসে এক নির্মম সত্য: এটি ছিল একটি ‘আত্মহত্যা’।

পড়ুন – বরিশাল আদালতে ভুল বিচার – করুন কাহিনী। 

প্রবাসীদের বঞ্চনা
প্রবাসীদের বঞ্চনা

সুমনের পরিচয়: স্বপ্নভঙ্গের করুণ পরিণতি

মৃত যুবকটির পরিচয় পাওয়া গেছে। তার নাম সুমন, পিতা আব্দুল বারিক। বাড়ি কুমিল্লার হোমনা উপজেলার নিলখী পরবোর গ্রামে। মাত্র ৭ মাস আগে অনেক স্বপ্ন নিয়ে সুমনের ইতালি আসা। কিন্তু কাঙ্ক্ষিত কাজ না পাওয়া আর ঋণের বোঝা হয়তো তাকে ঠেলে দিয়েছে এই চরম পরিণতির দিকে। আমাদের দেশীয় মিডিয়ায় খবরটি গুরুত্বের সাথে এলেও, যেন অনেকটা দায়সারাভাবেই প্রকাশিত হয়েছে।

পড়ুন – মদের আসরে সাগরিকা ও পারুলের উদ্দামতা। 

প্রবাসীদের বঞ্চনা
প্রবাসীদের বঞ্চনা

রেমিট্যান্স যোদ্ধা: শুধু কি ডলার পাঠানোর মেশিন?

আমরা প্রবাসীদের নিয়ে গর্ব করি। তারা আমাদের অর্থনীতির চাকা সচল রেখেছেন, তাই আদর করে তাদের নাম দিয়েছি ‘রেমিট্যান্স যোদ্ধা’। তারা জীবনের সেরা সময়গুলো বিদেশের মাটিতে হাড়ভাঙা খাটুনি খেটে দেশে ডলার পাঠান। কিন্তু এই যোদ্ধারা যখন আহত হন, নিহত হন কিংবা সুমনের মতো কোনো বিপদে পড়েন, তখন রাষ্ট্র যেন নিশ্চুপ হয়ে যায়।

একবার ভাবুন তো, এই প্রবাসীরা যদি মাত্র তিন মাস রেমিট্যান্স পাঠানো বন্ধ করে দেন, তবে টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া পর্যন্ত অর্থনীতির হালে আগুন লেগে যাবে। তবুও তাদের জীবন ও মৃত্যুর নিরাপত্তা নিয়ে আমাদের হাহাকার নেই।

 আমেরিকা, রাশিয়া রাষ্ট্রদূতদের দৌড় প্রতিযোগিতা, মজার কাণ্ড ! 

প্রবাসীদের বঞ্চনা
প্রবাসীদের বঞ্চনা

বিমানবন্দরের কফিনে বন্দি বাস্তবতা

যেদিন সুমনের লাশ দেশে ফিরবে, সেদিন হয়তো তার সাথে আরও ৬-৭ জন প্রবাসীর লাশ বিমানবন্দরে এসে পৌঁছাবে। বিএমইটি (BMET) হয়তো পরিবারকে লাশ বাড়ি পৌঁছানোর জন্য অ্যাম্বুলেন্স ভাড়াটুকু দেবে। কিন্তু দায় কি সেখানেই শেষ?

বিএমইটি-র অ্যাকাউন্টে বিদেশগামীদের কাছ থেকে নেওয়া কয়েক হাজার কোটি টাকা পড়ে আছে। অথচ একজন প্রবাসী মারা গেলে তার পরিবারকে প্রাপ্য সম্মান ও আর্থিক ক্ষতিপূরণ দিতে এত অনীহা কেন?

আমাদের দাবি: প্রবাসীদের অধিকার ও ক্ষতিপূরণ

একজন রেমিট্যান্স যোদ্ধা যদি প্রবাসে প্রাণ হারান, তবে তাকে নিছক দয়া নয়, বরং অধিকার হিসেবে ক্ষতিপূরণ দেওয়া উচিত:

  • মৃত্যুজনিত ক্ষতিপূরণ: প্রবাসী কর্মকালীন সময়ে দেশে যত টাকা পাঠিয়েছেন, তার অন্তত ২৫-৩০ শতাংশ পরিবারকে দেওয়া উচিত।

  • পঙ্গুত্ব বরণ করলে: যদি কেউ কর্মক্ষমতা হারিয়ে ফিরে আসেন, তবে তাকে ১০-১২ শতাংশ আর্থিক সহায়তা দেওয়া উচিত।

বিএমইটি-র জমা থাকা টাকার সুদ থেকেই এই বিশাল অংকের ক্ষতিপূরণ দেওয়া সম্ভব। প্রবাসীদের জীবনে যখন অকাল সন্ধ্যা নেমে আসে, তখন তাদের পাশে দাঁড়ানো রাষ্ট্রের কোনো করুণা নয়, বরং এটি তাদের প্রাপ্য।

উপসংহার: প্রবাসীদের কষ্টগুলো আমাদের চোখের আড়ালে থেকে যায়। সুমনদের আত্মত্যাগ যেন বৃথা না যায়, সেজন্য রাষ্ট্র ও সমাজকে আজ ভাবতে হবে।

লেখক: সেলিম হোসেন

তারিখ: ০৯/০২/২০২৪ ইং

(ছবিগুলো প্রতীকী হিসেবে ব্যবহৃত)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *